ঢাকা সোমবার,২৩,সেপ্টেম্বর, ২০১৯

"আসলেন, দেখলেন, জয় করলেন!"

image

বিনোদন ডেস্ক- 

"তিনি আসলেন, দেখলেন, জয় করলেন!" কিছু মানুষ এমনই হয় সম্ভবত। এভাবে তাঁরা আসেন এবং জয় করে নেন। এমনই একজন, বাংলা চলচ্চিত্রের যুবরাজ অমর নায়ক সালমান শাহ। খুব রাজসিকভাবে তাঁর আগমন হয়েছিল বাংলা চলচ্চিত্রে। নিজের স্বভাব সুলভ চাহনি, সুদক্ষ অভিনয় আর আধুনিকতায় নিজেকে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই  সুপরিচিত করে তুলেছিলেন তিনি। ১৯৯৩ সালে ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ এবং ১৯৯৭ সালে ‘বুকের ভিতর আগুন’ ৪ বছরে ক্যারিয়ারে ২৭টি সিনেমা উপহার দেন তিনি। কিন্তু সব ছেড়ে হঠাৎ করেই অতৃপ্ত বাসনায় অদেখা ভুবনে পাড়ি জমান এই অমর নায়ক


১৯৯৩ সালের কথা। পরিচালক সোহানুর রহমান সোহান জনপ্রিয় হিন্দি সিনেমার স্বত্ব কিনে নিয়ে নির্মাণ করলেন ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’। রোমান্টিক জুটি হিসেবে শাবনাজ-নাঈমের তখন বেশ জনপ্রিয়তা, কিন্তু দু’জনের কেউই পরিচালককে সময় দিতে পারলেন না।এসময়ের জনপ্রিয় নায়িকা মৌসুমী তখন জনপ্রিয় মডেল। নায়িকা হিসেবে পরিচালক সোহানুর রহমান সোহান বেছে নিলেন তাকে। কিন্তু নায়িকা পাওয়া গেলেও নায়ক সমস্যা’র কোন সমাধান হচ্ছিলো না। তৌকির, নোবেল সবার কাছেই অফার গিয়েছিল, ফিরিয়ে দিয়েছিলেন তাঁরা।

হঠাৎই সোহানুর রহমান সোহানের সাথে পরিচয় হয় এক তরুণের। তরুণের নাম শাহরিয়ার চৌধুরী ইমন। পরিচয়ের কিছুক্ষণের মধ্যেই সোহান খুঁজে পান তার নায়ক সমস্যার সমাধান। সেই তরুন ইমন হয়ে ওঠেন পরবর্তীকালের সালমান শাহ। কোন জনপ্রিয় নায়ক বা নায়িকা নয়, একদম নবাগত দুজনকে নিয়ে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আধুনিক রোমিও-জুলিয়েটের গল্পে সিনেমায় সালমান শাহ- মৌসুমী জুটি বাজিমাত করলেন প্রথম ছবিতেই। কেয়ামত থেকে কেয়ামত হয়ে গেলো বাংলা সিনেমার ইতিহাসেই অন্যতম ব্যবসাসফল সিনেমা।


তারপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। একের পর এক ব্যবসাসফল সিনেমা উপহার দিয়ে গেছেন বাংলা সিনেমা জগতকে। স্বপ্নের ঠিকানা, অন্তরে অন্তরে, বিক্ষোভ, সত্যের মৃত্যু নেই, তোমাকে চাই, মায়ের অধিকার, স্বপ্নের পৃথিবী, আনন্দ অশ্রুর মতো ব্যবসাসফল সিনেমা উপহার দিয়েছিলেন। যার বেশিরভাগ সিনেমাই জনপ্রিয় হয়েছিল, কালের প্রবাহে সিনেমারগুলোর চাহিদা যেন বেড়েই চলেছে দর্শকদের কাছে।


প্রথম সিনেমার পর সালমান-মৌসুমীর জুটির ব্যাপক চাহিদা থাকলেও,ব্যক্তিগত দ্বন্ধে তা দীর্ঘায়িত হয়নি,পরবর্তীতে শাবনূরের সাথে জুটি গড়ে তোলেন,যা রুপ নেয় বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম সেরা জনপ্রিয় জুটিতে। চলচ্চিত্রের গানেও রয়েছে এক বিস্ময়কর ঘটনা, ওনার প্রায় সব ছবিতেই রয়েছে একাধিক জনপ্রিয় গান।


তবে কেয়ামত থেকে কেয়ামত সিনেমার মধ্যে দিয়ে সিনেমা জগতে তার অভিষেক ঘটলেও ,মূলত আশির দশকে হানিফ সংকেতের ‘কথার কথা’ নামে একটা অনুষ্ঠানে মিউজিক ভিডিওর মডেল হিসেবে মিডিয়াতে তার যাত্রা শুরু হয়। এছাড়া কয়েকটি বিজ্ঞাপনচিত্রেও কাজ করেন তিনি। কেন্দ্রীয় চরিত্রে না থাকলেও সালমান শাহ’র অভিনয় জীবন শুরু হয়েছিল বিটিভ’তে প্রচারিত ‘পাথর সময়’ নাটকের মাধ্যমে। 

চলচ্চিত্রের দারুন ব্যস্ততার মাঝেও নাটকে অভিনয় করতেন সালমান শাহ। ‘নয়ন’ নামের একটি নাটকের নাম ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন তিনি। নাটকে, টেবিলের উপরে হাত প্রসারিত করে আঙ্গুলের ফাঁকে ফাঁকে ছুরি দিয়ে গাঁথার একটা দৃশ্য ছিল। কথিত আছে, শুধুমাত্র সালমান শাহ’র কারণে এই দৃশ্য ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। সেই সময় তরুণদের ক্রেজ হয়ে গিয়েছিলো টেবিলের উপরে হাত প্রসারিত করে আঙ্গুলের ফাঁকে ছুরি গাঁথা।


কিন্তু সব ছেড়ে ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর না ফেরার দেশে পাড়ি জমান তিনি।  রাজধানী ঢাকার ইস্কাটনে তাঁর নিজ বাস ভবনে সিলিং ফ্যানের সাথে ঝুলন্ত অবস্থায় তাঁর লাশ পাওয়া যায়। ময়না তদন্ত রিপোর্টে আত্মহত্যা বলে উল্লেখ করা হলেও তাঁর মৃত্যু নিয়ে রহস্য এখনো কাটেনি। অনেকেই সালমান শাহ-এর মৃত্যুর জন্য তাঁর স্ত্রী সামিরার দিকে অভিযোগের আঙুল তোলেন, এমনকি পরবর্তীকালে সালমানের পরিবারের পক্ষ থেকে স্ত্রী সামিরা ও আরো কয়েকজনকে আসামি করে মামলা দায়ের করা হয় কিন্তু পরে এই মামলার আর কোন অগ্রগতি হয়নি ফলে সালমানের মৃত্যু নিয়ে রহস্য আজ রহস্যই রয়ে গেছে। 

সালমান শাহ এতোটাই জনপ্রিয় ছিলেন যে তার মৃত্যু সংবাদ শুনে সেদিনই  সারা বাংলাদেশে প্রায় ২১ জন মেয়ে আত্মহত্যা করেন। আজ নেই সালমান শাহ। কিন্তু  প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম দর্শকদের অন্তরে অন্তরে রয়ে গেছেন তিনি। 

আন্দোলন৭১/এডি