ঢাকা বুধবার,২১,আগস্ট, ২০১৯

একটি আদর্শ রাষ্ট্র ও কিছু দায়বদ্ধতা

image

আবদুল হাকিম- 

এখনও পর্যন্ত পৃথিবীতে ১৯৫টি রাষ্ট্র স্বাধীন হয়েছে। যদি প্রশ্ন করি কেন স্বাধীন হয়েছে, তাহলে কি পূর্বে এই রাষ্ট্রগুলো পরাধীন ছিলো? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার আগে আমাদের জানা প্রয়োজন, স্বাধীন আর পরাধীন বলতে কি বুঝি বা এদের নমুনা কি। খুব সহজ করে যদি বলি, ভারতীয় উপমহাদেশ কেন ইংরেজদের শাসন থেকে স্বাধীন হয়েছিলো। ভালোই তো চলছিলো। আমি যদি ভুল বলে না থাকি, ইংরেজদের শাসনের আগে ভারতীয় উপমহাদেশ ছিলো অন্ধকারে আচ্ছন্ন একটি জনপথ। যেখানে ছিলো না গণমাধ্যমের ব্যবস্থা, শিক্ষাদীক্ষা, জ্ঞানবিজ্ঞান, চিকিৎসা, বিচারিক আদালত এবং শিল্প ও বাণিজ্য। ইংরেজরা ক্ষমতা গ্রহণের পর আগে নিশ্চিত হয়েছিলো এ সমস্ত মৌলিক অধিকার। তবে হ্যাঁ, আরেকটি মৌলিক অধিকার ছিলো পরাধীন। সেটি হলো, নিরাপদ ও সঙ্কাহীনভাবে বেঁচে থাকা। ব্রিটিশরা এই মহাদেশের মানুষের সকল অধিকার দিয়েছিলো ঠিকই, কিন্তু ভোগ করার মর্জি ছিলো ওদের হাতে। ওদের ইচ্ছা ছিলো এখান থেকে যে করেই হোক সকল সম্পদ লুট করা এবং এদেশের জনগণকে ওদের চাকরে পরিণত করা। প্রয়োজনে কাউকে বাঁচিয়ে রাখা, কাউকে মেরে ফেলা, কাউকে ধর্ষণ করা আবার তাদের মর্জি অনুযায়ী কাউকে রাজত্ব দান করা। সবকিছুই ছিলো, কিন্তু প্রভুদের কৃপায় সীমাবদ্ধ ছিলো।  আর এর নামই পরাধীনতা।

স্বাধীনের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে সিনিয়র সাংবাদিক পলাশ মাহবুব তাঁর ‘পঁচিশে মার্চ’ ছড়ায় বলেছেন, ‘ভাতের সঙ্গে মাছ খাবো না শাক খাবো, মন চাইলে দিক-বিদ্বিকে পাক খাবো, ইচ্ছে হলে ছায়ার সাথেও ‘টাক’ খাবো। গোলার ধানে চিড়া নাকি খই খাবো, পুকুরে শিং, মাগুর নাকি কই হবে, আমি যা চাই ক্ষেতে ফলন ঐ হবে। আমার ঘরে টিন দেবো না ছই দেবো, বলবো আমি জানালা কটা, কই দেবো, আমার ধানে আমার মতো মই দেবো। বর্গি এসে করবে না আর ইচ্ছেগুলো চুরি-পঁচিশে মার্চ থেকে আমি আমার মতন উড়ি।’

১৯৪৭ সালে যখন ভারত ভাগ হলো, তখন দেশের মানুষ মনে করেছিলো এবার হয়তো ব্রিটিশদের থেকে মুক্তি পাবো। কিন্তু কারো অধীনে থেকে যে কখনও মুক্তির কল্পনা করা যায় না এটা পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করেছিলো। সে সময় ছিলো না মানুষের জীবিকার নিরাপত্তা, বসবাসের নিরাপত্তা, শিক্ষা, চিকিৎসা এমনকি বেঁচে থাকার অধিকারটুকুও ছিলো না। তাই ৩০ লক্ষ মানুষের রক্ত ও ৩ লক্ষ মা বোনে সম্ভ্রম হারিয়ে লড়াই করে এনেছিলো স্বাধীনতা। বাঙালি ভেবেছিলো, এখন অন্তত রাষ্ট্রটা আমাদের। খেয়ে থাকি আর না খেয়ে থাকি, অন্তত আমাদের মতো করে দেশটা সাজাবো। এমন পরিশ্রম করবো, একদিন আমাদের কোন খাবারের অভাব থাকবে না, রাস্তায় ঘুমাতে হবে না, নিরাপদভাবে বাঁচতে পারবো, আর কোন নারীকে সম্ভ্রম হারানো বা ধর্ষিত হতে হবে না। বিচারহীনতার অভাবে আদালতে কাঁদতে হবে না। প্রশাসনগুলো পাকিস্তানের হানাদার বাহিনীতে পরিণত হবে না, ‘কেউ খাবে কেউ খাবে না’ এই নীতিতে দেশ চলবে না। সকল ধরনের শিক্ষা ও চিকিৎসা সবধরনের মানুষ নিতে পারবে। চিকিৎসার অভাবে আর কোন অসহায় মানুষকে মরতে হবে না।

সবচেয়ে অমানবিক কাজ হলো, একজন মানুষ অন্ধ, আবার তাঁর হাত পা নেই, তাঁকেও রাস্তায় গড়াতে গড়াতে ভিক্ষা করতে হয়। এটা একটা স্বাধীন ও আদর্শ রাষ্ট্রের জন্য খুবই অন্যায় ও লজ্জাকর বিষয়। যে রাষ্ট্র ন্যুনতম মানুষের খাবারের, বসবাসের, চিকিৎসার এবং নিরাপদভাবে বেঁচে থাকার অধিকার দেয়নি, সে রাষ্ট্র স্বাধীন নয়, আদর্শের ছিটেফোঁটা এখানে নেই। স্বাধীনতার আগেও যা ছিলো, স্বাধীনতার ৪৮ বছর পরও তাই আছে। পরিবর্তন শুধু হয়েছে স্বৈর শাসকদের পালাবদলের। পরিবর্তন হয়েছে এদের চেহারার। কিন্তু আদর্শগত দিক থেকে সবাই সমান।  

আজ থেকে ২০ বছর আগে দেখতাম, গ্রামেগঞ্জে সরকারি, বেসরকারিভাবে মানুষের বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে পরিবার পরিকল্পনার কথা বলা হতো। শেখানো হতো, ছোট পরবিার মানে সুখি পরিবার। দুটির বেশি সন্তান নয়, একটি হলে ভালো হয়। ঐ সময়টা বেশ ভালো ছিলো। জনসংখ্যা কম ছিলো, সবকিছুই অল্প হলেও নিরাপদ ছিলো। বর্তমানে দেখছি, সরকারের এ সকল পরিকল্পনায় ঝিমে গেছে। মানুষ যেমন শিক্ষিত হচ্ছে, তেমন অজ্ঞদের মতো হুর হুর করে জনসংখ্যা বাড়িয়েই যাচ্ছে। তাদের ভাষ্য হলো ‘মুখ থাকলে ঈশ্বর খাবারের ব্যবস্থা করবেনই’। কিন্তু এরা বুঝতে চাইছে না যে, একজনের খাবারই সবাই ভাগ করে খাচ্ছে, একজনের সুযোগ-সুবিধাই সবাই ভাগ করে নিচ্ছে। তাতে যেমন অসুবিধা হচ্ছে সবার, আবার দূষিত হচ্ছে পরিবেশ। এতে পৃথিবী আজ হুমকির মুখে। বিলীন হয়ে যেতে পারে জীববৈচিত্র। এখন রাষ্ট্র এ সকল সচেতনতামূলক কাজেও দায় সারা। কারণ, রাষ্ট্র এখন নিজেও সচেতন নয়।

২০১৮ সালে সারাদেশে ৮ হাজার ৪৬১ টি আবাসিক ভবনে আগুন লাগে।  এর মধ্যে ২ হাজার ৮৮টি দুর্ঘটনাই ছিল ঢাকায়।  শিল্প কারখানায় ১ হাজার ১৩১টি অগ্নিকান্ডের ৫২৬টিই ঢাকায়। ‘বেলা’র এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত এক দশকে ১৬ হাজার অগ্নিকান্ডের সারাদেশে মৃতের সংখ্যা প্রতি বছর গড়ে ১৫৯ জন।  অথচ ২০১৮ সালেই ঢাকায় মৃতের সংখ্যা ১২১ জন (সময় টিভি অনলাইন)। চলতি বছরই প্রায় শতাধিক মানুষ আগুনে পুড়ে মারা গেছেন। ধারাবাহিক এই ঘটনায়, আজ আমাদের ঢাকা  বিশ্বে আগুনের শহরেও চ্যাম্পিয়ান হয়েছে। এখন এটা রাজধানী নয়, ধীরে ধীরে লাশধানীতে পরিণত হচ্ছে। বিশ্বে নোংরা শহরে প্রথম/দ্বিতীয় অনেক আগে থেকেই। অনিরাপদ শহরে দ্বিতীয়। এমন অনেক অর্জনই রেকর্ডের তালিকায় প্রথমে আমরা। এগুলো নিরসন করা শুধু রাষ্ট্রের দায়িত্ব নয়, জন্মলগ্ন থেকে দায়বদ্ধতাও বটে।

৩০ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রাতে গণধর্ষণের শিকার হন নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার চার সন্তানের এক মা। স্বামী ও সন্তানদের বেঁধে রেখে তাঁকে ধর্ষণ করেন ধর্ষকেরা। এরপরই শুরু হয়েছে ধর্ষণের মহোৎসব। চলতি বছর ২০১৮ সালে প্রথম ২৩ দিনে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৩০ জন। অর্থাৎ, প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। ধর্ষণের শিকার বেশির ভাগই শিশু ও কিশোরী।

পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী ২০১৪ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত গত পাঁচ বছরে ১৯ হাজারের বেশি ধর্ষণের মামলা হয়েছে। অর্থাৎ, দিনে গড়ে ১১টি মামলা হয়েছে। এপ্রিল মাসের প্রথম ১৫ দিনে সারা দেশে ৪৭ শিশু ধর্ষণ, ধর্ষণচেষ্টা ও যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে (প্রথম আলো)। এভাবে চলতে থাকলে বছর শেষে এ সংখ্যা পৃথিবীর সকল রেকর্ড ছাপিয়ে যাবে। আবারও বাংলাদেশ ধর্ষণে বিশ্বে প্রথম তালিকায় আসবে। এখানেও রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা রয়েছে।

এখনও ঘুরে দাড়ানোর সময় রয়েছে। রাষ্ট্রের উচিৎ জনগণের ক্ষমতা জনগণকে ফিরিয়ে দেওয়া। যেই ৫টি মৌলিক অধিকারের জন্য দেশ স্বাধীন হয়েছিলো, সাধারণ মানুষের জন্য তা নিশ্চিত করা। সর্বোপরি দেশের সকল দায় নিয়ে একটি আদর্শ রাষ্ট্র গঠন করা।

লেখক: 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, আন্দোলন৭১ ডটকম। (hakimmahi2017@gmail.com)