ঢাকা মঙ্গলবার,২০,আগস্ট, ২০১৯

কলাপাড়ায় পিইডিপি'র কোটি-কোটি টাকা গেল কই?

image

গোফরান পলাশ-

পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় প্রাইমারী এডুকেশন ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (পিইডিপি)-৪ এর আওতায় ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে মাইনর রিপেয়ার, রাজস্ব বাজেটের আওতায় রুটিন মেইনটেন্যান্স, নিড বেইজড প্লেয়িং অ্যাকসেসরিস, ওয়াশ ব্লক, ঘূর্নিঝড় ফনি পরবর্তী মেরামত সংস্কার, স্কুল লেভেল ইমপ্রুভমেন্ট প্লান (স্লিপ) এবং ভবন ও সংস্কার খাতে মেরামত সংস্কার প্রকল্পের বরাদ্দকৃত ২ কোটি দুই লক্ষ ৫৫ হাজার টাকার সিংহভাগ লোপাটের অভিযোগ উঠেছে।

এতে প্রাথমিক শিক্ষার মান উন্নয়নে সরকারের মহতী উদ্দোগ বাধাগ্রস্ত হওয়াসহ দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি প্রশ্নের সম্মুখীন হয়ে পড়েছে।

অথচ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস বলছে, সরকারের বরাদ্দকৃত অর্থের যথাযথ ব্যবহার করা হয়েছে। আর জেলা শিক্ষা অফিস বলছে, দুর্নীতি-অনিয়মের লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস ও নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়, উপজেলার ১৭২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাথমিক শিক্ষার মান উন্নয়নে ২০১৮-১৯ অর্থ বছরে সরকার রাজস্ব খাতের আওতায় ২ কোটি দুই লক্ষ ৫৫ হাজার টাকার প্রকল্প গ্রহণ করে। তন্মধ্যে পিইডিপি-৪ এর আওতায় মাইনর মেরামত প্রকল্পে ২৪টি স্কুলে ২ লক্ষ টাকা করে ৪৮ লক্ষ টাকা, ভবন ও স্থাপনা খাতে মেরামত সংস্কার প্রকল্পে ২২ টি স্কুলে ১ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা করে ৩৩ লক্ষ টাকা, ঘূর্নিঝড় ফনি পরবর্তী মেরামত সংস্কার প্রকল্পে ৬টি স্কুলে ১ লক্ষ টাকা করে ৬ লক্ষ টাকা, নিড বেইজড প্লেয়িং অ্যাকসেসরিস প্রকল্পের অধীনে ১টি স্কুলে ১ লক্ষ টাকা, রুটিন মেইনটেন্যান্স প্রকল্পে ৭৮টি স্কুলে ৪০ হাজার টাকা করে ৩১ লক্ষ ২০ হাজার টাকা, ওয়াশ ব্লক প্রকপ্লে ১০ হাজার টাকা করে ২৩টি স্কুলের ২৫টি ওয়াশ রুম সংস্কারের জন্য ৪ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা, স্লিপ প্রকল্পে ৫০-৮৫ হাজার টাকা করে ১৪৫টি স্কুলে ৭৮ লক্ষ ৮৫ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয় সরকার।

এলজিইডি’র সহায়তায় এসব উন্নয়ন কাজের প্রাক্কলন তৈরী করে কিছু স্কুলে দায় সারা গোছের কাজ চলমান রয়েছে। কিছু স্কুলে একটু রঙ করা হয়েছে। তবে অধিকাংশ স্কুলে কোন কাজ না করেই ফান্ড ফেরৎ যাওয়ার অজুহাতে কাগজে কলমে কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের উন্নয়ন বরাদ্দের অর্থ ছাড় করে প্রাথমিক শিক্ষা অফিস, ইউএনও’র দপ্তর, এলজিইডি অফিস, হিসাব রক্ষন অফিস, সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি ভাগাভাগি করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

এছাড়া প্রাথমিক ও গন শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের নির্দেশিত স্পেসিফিকেশন এড়িয়ে সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় গুলোতে স্লিপ প্রকল্পের অর্থে ডিজিটাল হাজিরা মেশিন ক্রয়ের নামে লাভবান হয় স্কুলের প্রধান শিক্ষক, শিক্ষা অফিসসহ কতিপয় প্রভাবশালী। যা পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়য় ক্রয় বারিত করলেও অর্ধ-শতাধিক স্কুল ইতোমধ্যে ক্রয় সম্পন্ন করে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, উন্নয়ন প্রকল্পের এসব বরাদ্দে সরকারী ভ্যাট কর্তন ছাড়া পিইডিপি-৪ প্রকল্পে স্কুল প্রতি এলজিইডি অফিস ৫%, শিক্ষা অফিস ৭%, হিসাব রক্ষন অফিস ২%, রুটিন মেইনটেন্যান্স প্রকল্পে স্কুল প্রতি শিক্ষা অফিস ৬%, হিসাব রক্ষন অফিস ২%, ওয়াশ ব্লক প্রকল্পে স্কুল প্রতি শিক্ষা অফিস ৭%, হিসাব রক্ষন অফিস ২%, নিড বেইজড্ প্লেয়িং অ্যাকসেসরিস প্রকল্পে শিক্ষা অফিস ৮%, হিসাব রক্ষন অফিস ২%, ঘূর্নিঝড় ফনি পরবর্তী মেরামত সংস্কার প্রকল্পে স্কুল প্রতি এলজিইডি অফিস ৫%, শিক্ষা অফিস ৭%, হিসাব রক্ষন অফিস ২%, স্লিপ প্রকল্পে স্কুল প্রতি শিক্ষা অফিস ৭%, হিসাব রক্ষন অফিস ২% এবং ভবন ও স্থাপনা খাতে মেরামত সংস্কার প্রকল্পে স্কুল প্রতি ইউএনও ৩%, শিক্ষা অফিস ৭%, হিসাব রক্ষন অফিস ২% হারে টাকা রেখে সরকারী বরাদ্দকৃত অর্থ ছাড় দেয়।

পার্সেন্টিজের এসকল টাকা শিক্ষকদের নিকট থেকে শিক্ষা অফিসার নিজে গ্রহণ না করে অফিসের উচ্চ মান সহকারী আ: হক, অফিস সহকারী নজরুল ইসলাম এবং কলাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নজরুল ইসলাম স্কুলগুলোর প্রধান শিক্ষকদের নিকট থেকে উত্তোলন করলেও ভুক্তভোগী শিক্ষকরা হয়রানীর ভয়ে গণমাধ্যমের কাছে নিজেদের নাম প্রকাশে রাজী হয়নি।

তবে স্কুলে শিক্ষকদের হাজিরা দেয়ার জন্য ডিজিটাল ডিভাইস ক্রয়ের জন্য ৬-১০ হাজার টাকা ব্যয় করে স্কুল প্রতি ১৫-২০ হাজার টাকার ভাউচার করে লাভবান হয়েছেন প্রায় অর্ধশত স্কুলের প্রধান শিক্ষক, শিক্ষা অফিসসহ কতিপয় প্রভাবশালী। এসকল পার্সেন্টিজ প্রদানের পর অবশিষ্ট টাকা স্কুলের প্রধান শিক্ষক ও স্কুল পরিচালনা পর্ষদের সভাপতির মর্জিতে খরচান্ত ও পকেটস্থ করা হয়। এতে কিছু স্কুলে দায় সারা গোছের কিছু কাজ হলেও সরকারের বরাদ্দকৃত অর্থের সিংহ ভাগই লোপাটের অভিযোগ রয়েছে।

এ বিষয়ে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো: আবুল বাশার আন্দোলন৭১ নিউজকে জানান, শিক্ষা অফিস ভ্যাট ছাড়া স্কুল গুলোতে উন্নয়ন প্রকল্পের বরাদ্দকৃত টাকা থেকে কোন টাকা রাখেনি। এছাড়া উচ্চ মান সহকারী আ: হক, অফিস সহকারী নজরুল ইসলাম এবং কলাপাড়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নজরুল ইসলাম কোন টাকা রেখেছেন কিনা সেটি তার জানা নেই বলে জানান।

এ বিষয়ে জানতে ইউএনও মো: মনিবুর রহমান’র সরকারী নম্বরে যোগাযোগ করা হলে সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও ভারপ্রাপ্ত ইউএনও অনুপ দাস ফোন রিসিভ করে জানান, 'স্যার চার দিনের ছুটিতে রয়েছেন। প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়নের ভবন ও স্থাপনা খাতে মেরামত সংস্কার প্রকল্পের অর্থ ছাড়ের বিষয়টি তিঁনি (স্যার) বলতে পারবেন। চেকে তিঁনি স্বাক্ষর করেছেন।'

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো: ছাইয়েদুজ্জামান আন্দোলন৭১ নিউজকে জানান, 'উপজেলা শিক্ষা অফিসে ভ্যাট ছাড়া উন্নয়ন প্রকল্প থেকে কোন টাকা রাখার কারন নাই। আমি উপজেলা শিক্ষা অফিসারের সাথে এখনই বিষয়টি নিয়ে কথা বলছি। টাকাটা যদি তিনি রেখে থাকেন, তবে কেন রাখলেন ?'

জেলা শিক্ষা অফিসার আরও জানান, 'এটি সবাই জানে হিসাব রক্ষন অফিসে টাকা ছাড়া কোন বিল পাশ হয় না। এটি অলিখিত হলেও সত্যি। তবে উপজেলা শিক্ষা অফিসে এ সংক্রান্ত কোন অনিয়ম হলে এবং অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেয়া হবে।'

আন্দোলন৭১/জিএ