ঢাকা সোমবার,২৩,সেপ্টেম্বর, ২০১৯

চাঁদে নামার আগেই হারিয়ে গেল বিক্রম

image

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ডেস্ক-

নেমে আসছিল নিখুঁত ভাবেই। ভারতের চন্দ্রযান-২ এর অবতরণ ঘিরে গভীর উদ্বেগ তৈরি হচ্ছিল ইসরো-র বিজ্ঞানীদের মধ্যে। কিন্তু চাঁদের মাটি থেকে আকাশে ২.১ কিলোমিটার উপরে থাকার সময় ইসরো সঙ্গে যোগাযোগ হারিযে ফেলল বিক্রম!

ঠিক ৪৭ দিনের যাত্রা। একেবারে দিনক্ষণ মেপে চাঁদে নামছিল বিক্রম। দক্ষিণ মেরুর কাছে। যেখানে আজ পর্যন্ত আর কোনও দেশের যান পা রাখেনি।  ভারতের দ্বিতীয় চন্দ্রযানের এই ল্যান্ডারের পেটে রয়েছে ছোট্ট  চাঁদের গাড়ি বা রোভার প্রজ্ঞান। কয়েক ঘণ্টা পরে দক্ষিণ মেরুর কাছে ভোর হওয়ার কথা। ঠিক ছিল তার আগেই খুলে যাবে বিক্রমের ডালা বা র‌্যাম্প। তার উপর দিয়ে গড়িয়ে নামবে প্রজ্ঞান। ভোর ৫টা ১৯ মিনিটে। ভোরের আলো ফুটলে সেই আলো সোলার প্যানেলে মেখে জেগে উঠবে চাঁদের গাড়ি। ভোর ৫টা ২৯ থেকে প্রতি মিনিটে ৬০ সেন্টিমিটার করে এগোবে। তার পরে বিক্রম প্রজ্ঞান শুরু করবে খোঁজ, কী কী আছে চাঁদের মাটিতে ও চাঁদের উপরে! অরবিটার তো আগে থেকেই ছবি তুলে চলেছে চাঁদের। যা দিয়ে তৈরি হবে পথিবীর একমাত্র উপগ্রহের ত্রিমাত্রিক মানচিত্র।

শ্রীহরিকোটা থেকে চন্দ্রযান ২-এর যাত্রা থমকে গিয়েছিল শেষ মুহূর্তে। ত্রুটি সামলে এক সপ্তাহ পরেই গত ২২ জুলাই বাহুবলী রকেটের ঘাড়ে চেপে রওনা দিয়েছিল ভারতের দ্বিতীয় চন্দ্রযান। তখনই ঠিক হয়েছিল যাত্রা পিছিয়ে গেলেও আগের নির্ধারিত দিনেই গন্তব্যে পৌঁছৈ দেওয়া হবে চন্দ্রযান ২-কে। ৭ সেপ্টেম্বর ১০০ দিন পূর্ণ হবে নরেন্দ্র মোদীর সরকারের। সাফল্যের তালিকায় চন্দ্রবিজয়কে জুড়ে নেওয়ার পক্ষে এমন ভাল দিন আর কী হতে পারত শাসক শিবিরের কাছে! কিন্তু হল না। নামার আগে হারিয়ে গেল বিক্রম।

আগামিকাল, সরকারের ১০০ দিন পূর্ণ হওয়ার দিনে এমন একটা সাফল্য আসতে চলেছে— প্রধানমন্ত্রী তা নিয়ে খুবই উৎসাহিত ছিলেন দিনভর। আজ সকাল থেকেই একের পর এক টুইট করে গিয়েছেন তিনি। কোনওটিতে দেশবাসীকে এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী থাকতে বলেছেন। কখনও জানিয়েছেন, তাঁর বেঙ্গালুরুতে আসার কথা। সারা দেশ থেকে কুইজের মাধ্যমে বেছে নেওয়া যে ৬০ পড়ুয়া বেঙ্গালুরুতে তাঁর সঙ্গে বসে অবতরণ দেখবে, টুইট করেছেন তাদের নিয়েও। কিন্তু শেষ রক্ষা হল না।

গভীর রাতে এমন একটা ঘটনা প্রত্যক্ষ করার জন্য গোটা দেশেই আগ্রহ ছিল তুঙ্গে। দেশের শহরে-গঞ্জে ও গ্রামে শুক্রবারের রাতটা গোটা দেশ কার্যত জেগেই ছিল। 

যাত্রা পিছিয়ে গেলেও পৌঁছনোর দিন একই রাখায় প্রশ্ন উঠেছিল, তাতে কোনও বিপত্তি হবে না তো! ইসরো আশ্বাস দিয়েছিল, এর জন্য গতি কিছুটা বাড়াতে হবে। পৃথিবীকে পাঁচ পাক ও চাঁদের চার পাশ পাঁচ পাক খাবে চন্দ্রযান ২। তার মাপজোকেও কিছু বদল অবশ্যই ঘটাতে হবে। গোটা দেশ ভরসা রেখেছিলেন ইসরোর বিজ্ঞানীদের উপরে। আজ তাঁদের সাফল্যের মুকুটে যোগ হতে পারত নতুন পালক। রাশিয়া, আমেরিকা ও চিনের পরে ভারত হত চতুর্থ দেশ, যাঁরা বায়ুমণ্ডলহীন চাঁদে যান নামাতে পেরেছে পালকের মতো। মঙ্গলগ্রহে বায়ুমণ্ডল রয়েছে। সেখানে যানের আছড়ে পড়া থেকে ঠেকাতে বায়ুর বাধাকে কাজে লাগিয়েছিল আমেরিকা। নাসার বিজ্ঞানী অনিতা সেনগুপ্তের নেতৃত্বে তৈরি হয়েছিল বিশেষ প্যারাশুট। কিন্তু চাঁদে বাতাস নেই। বিক্রমের নীচে লাগানো তরল ইঞ্জিনের চারটি রকেটকে নানা পর্যায়ে  চালু করে এর গতি নিয়ন্ত্রণ করার কথা ছিল। সে কাজ শুরু করেও মাঝপথে ছিটকে গেল ইসরো।

চাঁদে অবতরণ বিশ্বে নতুন নয়। ষাট বছর আগে ১৩ সেপ্টেম্বর প্রথম বার চাঁদে যন্ত্র-দূত বা ল্যান্ডার নামিয়েছিল রাশিয়া। ১৯৬৯ সালে আমেরিকা মানুষ পাঠিয়েছে চাঁদে। চিনও চাঁদে পৌঁছেছে। গত ১১ এপ্রিল চাঁদে নামতে গিয়ে ইজরায়েলের মহাকাশযান ভেঙে পড়েছিল। ফলে  ভারতের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশের কাছে এ ছিল এক নতুন পরীক্ষা। এই সফ্‌ট ল্যান্ডিং  ভারত আগে কখনও করেনি। মানসিক ভাবে প্রচণ্ড চাপে ছিলেন অভিযানের সঙ্গে যুক্ত ইসরোর প্রত্যেক বিজ্ঞানীরা


রাত ১টা ২২, মিডিয়া সেন্টারের পর্দায় তখন দেখা যাচ্ছে, কম্পিউটারে শেষ মুহূর্তের খুঁটিনাটি পরীক্ষা করছেন ইঞ্জিনিয়ারেরা। প্রাক্তন ইসরো চেয়ারম্যান এ এস কিরণকুমারকে দেখা গেল, ঘুরে ঘুরে ইঞ্জিনিয়ারদের সঙ্গে কথা বলতে। বিরাট জায়ান্ট স্ক্রিনে এক বার ভেসে উঠল, প্রথম অবতরণস্থলের ছবি। তা দেখেই মিডিয়া সেন্টারের সাংবাদিকদের মধ্যেও চাঞ্চল্য তৈরি হল। 

রাত ১টা ৩৮-এ শুরু হল গায়ে কাটা দেওয়া শেষ কয়েকটা মিনিট। বিক্রম তার কৃত্রিম মেধা দিয়ে প্রাথমিক ব্রেক কষা শুরু করল। সে তখন চাঁদের ৩০ কিলোমিটার উপরে। বিক্রমের ঠিক মাথার উপরে থেকে ছবি তুলে পৃথিবীতে পাঠিয়ে চলেছে অরবিটার। সেই ছবি পর্দায় ভেসে উঠতেই কন্ট্রোল রুমে হাততালি বিজ্ঞানীদের। দর্শকের আসনে মোদীরও। ১০ মিনিট পরে ফের গতি কমানোর কাজ সারল আরও সূক্ষ্ম পর্যায়ে। সে তখন চাঁদের মাটি থেকে ৭ কিলোমিটার উপরে। প্রাথমিক ভাবে একটি অবতরণস্থল ও তার বিকল্প ঠিক করা থাকলেও ১টা ৫০ মিনিটে বিক্রম তার তোলা ছবির ভিত্তিতে ল্যান্ডিং সাইট বাছাই বা ‘লোকাল নেভিগেশন’ শুরু করল।

বিক্রম তখন ২.১ কিলোমিটার উপরে। থমকে গেল পর্দা। কন্ট্রোল রুমে পিন পড়ার শব্দও শোনা যাবে। ইঞ্জিনিয়ারেরা হঠাৎ গম্ভীর। কারও মাথায় হাত। কোনও ঘোষণা নেই। এক অদ্ভুত নীরবতা। রাত ১টা ৫৩, প্রধানমন্ত্রীর গালে হাত। চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়েছেন শিবন, কিরণকুমার। কন্ট্রোল রুম নিশ্চুপ। কী হল, বোঝা যাচ্ছে না। মিশন কন্ট্রোল রুমে যোগাযোগ করছেন বিজ্ঞানীরা। সিবনের সঙ্গে কথা মোদীর। সঙ্গে কিরণকুমার, কস্তুরীরঙ্গন। সকলের চোখেমুখে উদ্বেগ। ২টো ৬ নাগাদ ঘোষণা, ল্যান্ডারের সঙ্গে যোগাযোগ করা গিয়েছে। তার গতিপথের তথ্য ফের আসতে শুরু করেছে। ছবিও আসছে। কিন্তু পর্দায় ভেসে উঠল পুরোনো গ্রাফিকের ছবি। শিবন ঘোষণা করলেন, বিক্রম ২.১ কিলোমিটার উপরে থাকা পর্যন্ত যোগাযোগ ছিল। তার পরে বিক্রমের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছে।    

আশা করা হচ্ছিল কামাল দেখাবে কৃত্রিম মেধা! এর পরে চারটির মধ্যে দু’টি রকেটকে কাজে লাগিয়ে নীচে আসার পরে মাঝের একটি রকেট চালিয়ে নিজের গতি নিয়ন্ত্রণ করে, ঠিক যে ভাবে হেলিকপ্টার হেলিপ্যাডে নেমে আসে, ঠিক তেমন ভাবে চাঁদে তার চার পা রাখবে ভারতের বিক্রম। তার আগের মিনিটে নিদের তোলা চাঁদের ছবি পাঠিয়ে দেবে পৃথিবীতে

আন্দোলন৭১/হাবীব