জায়ান-রাসেল ধর্ম ও রাজনীতির বলি

image

আবদুল হাকিম- 

শোককে শক্তিতে পরিণত করে বেঁচে থাকাই মানুষের বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ, জীবনে ক্ষণিকের সুখ এসে মানুষকে যেভাবে হাসায়, আঘাত-প্রতিঘাতের মত দুঃখ এসে তার চেয়ে বেশি ধুয়ে নিয়ে যায়। একই পরিবারের দু’জন ৮ বছরের শিশু জায়ান ও রাসেল। আর দু’জনই ধর্ম ও রাজনীতির বলি হয়েছেন। রাসেল হয়েছেন ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতার সাথে রাজনৈতিক বলি, আর জায়ান ২০১৯ সালের ২১ এপ্রিল শ্রীলঙ্কায় ধর্মীয় রাজনীতির বলি। প্রশ্ন হলো কেনো একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলো? ধরে নিলাম, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশকে স্বাধীন করে নিপীড়িত ও অত্যাচারিত মানুষকে মুক্ত করে দিয়ে ভুল করেছেন। পাকিস্তানের সাথে থেকে এ দেশের মানুষের অত্যাচার সইতে ভালো লাগতো, বঙ্গবন্ধু সেটি চাননি; তিনি চেয়েছেন মানবতার মুক্তি, এটা তাঁর অন্যায়। এজন্য তাঁকে প্রতিদান স্বরূপ হত্যা করা হয়। কিন্তু ৮ বছরের রাসেল কী দোষ করেছিলো, যে তাকেও বুলেটের আঘাতে নির্মমভাবে হত্যা হতে হলো? এই প্রশ্নের উত্তর ঘাতকদের জানা নেই; কারণ তারা ঘাতক, জল্লাদ। 

জায়ানেরও বয়স ৮ বছর। বাবা মায়ের সঙ্গে শ্রীলঙ্কায় বেড়াতে গেছেন। দেখতে গিয়েছেন অতিথি হয়ে ওই দেশের মানুষ ও প্রকৃতিকে। রোববার ২১ এপ্রিল ইস্টার সানডের দিন সকালে সাংগ্রিলা হোটেলের নিচতলার রেস্তোরাঁয় নাশতা করতে গেলেন বাবা মশিউল হক চৌধুরী প্রিন্সের সাথে বড় ছেলে জায়ান চৌধুরী। কে জানতো নাশতা খাওয়ার আগেই হাসিখুশিতে ভরা ছোট্ট মুখখানি আত্মঘাতী বোমার আঘাতে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাবে, নাশতা খাওয়ার আগেই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করতে হবে! যে ধর্ম মানুষকে সম্প্রীতি শেখায়, উদারতা শেখায়, সুন্দর করে বেঁচে থাকা শেখায়, সেই ধর্মই আবার ৮ বছরের শিশুকে নারকীয় কায়দায় হত্যা করে। বারবার এই শোক শক্তিতে পরিণত করা যায় না। বুঝলাম, বড়রা মুক্তমনা হয়ে, অন্যধর্মের হয়ে অন্যায় করেছে মুসলমানদের নিকৃষ্ট ধর্মানুভূতিতে সুড়সুড়ি দিয়েছে। কিন্তু জায়ান কী ক্ষতি করেছে ধর্মের? কী ক্ষতি করেছে মুসলমানদের? অথচ মুসলমানদের ধর্মীয় গ্রন্থে বলা হয়েছে, ‘বিচারহীনভাবে কোন মানুষকে হত্যা করলে, পুরো মানব জাতিকেই হত্যা করা হবে’। জায়ান কেনো মুসলমানদের দ্বারা হত্যা হলো? ও তো বোঝে না মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ এবং খ্রিস্টান কী। জানে না এদের নোংরা অনুভূতির কথা। জায়ানের বাবা মশিউল হক চৌধুরী প্রিন্সও শঙ্কা মুক্ত নয়। তিনিও কলম্বোর একটি হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। মুসলমানদের এর জবাব দিতে হবে।

একটা হত্যার পেছনে কতগুলো স্বপ্ন বিলীন হয়ে যায়, সেটা হয়তো আমাদের জানা নেই। জায়ানের সম্পর্কে দাদা আবু নোমান চৌধুরী প্রথম আলোর এক সাক্ষাৎকারে বলেন, জায়ান এবার মা-বাবাকে নিয়ে গ্রামে আসবে। সেই সঙ্গে তার নানা শেখ সেলিম সাহেবেরও আসার কথা ছিলো। সে জন্য আমি ২০ দিন আগে গ্রামে আসি। বাড়িঘরের টুকটাক কাজ করাই। বাড়ির সামনের রাস্তায় নতুন মাটি ফেলি’। কতো স্বপ্ন নাতিকে ঘিরে; নাতি আসবে, আবার শান্ত বাড়িটি হইহুল্লড়ে মেতে উঠবে।    আবু নোমান চৌধুরী আরও বলেন, ‘জায়ান এভাবে আমাদের ছেড়ে চলে গেল, এটা ভাবতে কষ্ট হচ্ছে। তারা কেন আমার নিষ্পাপ নাতিকে মারল’। এটা শুধু জায়ানকে হত্যা নয়, এটা পুরো মানব জাতির চেতনাকে হত্যা। 

বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২৪ এপ্রিল একাদশ জাতীয় সংসদ অধিবেশনের প্রথম দিন জায়ানের স্মৃতি চারণ করে বলেন, ‘জায়ান একটি ৮ বছরের শিশু। ওর মতো আরও ৪০ জন শিশুকে শ্রীলঙ্কায় হত্যা করা হয়েছে। এটা অত্যান্ত নেক্কার জনক। সন্ত্রাসীদের কোন ধর্ম নেই, কোন দেশ-কাল-পাত্র নেই। সন্ত্রাসী কেবলই সন্ত্রাসী’। জায়ান প্রধানমন্ত্রীর সম্পর্কে নাতি। সাংসদ শেখ সেলিম প্রধানমন্ত্রীর ফুফাতো ভাই। 

প্রতিদিন ফিলিস্তিন, ইসরায়েল, ইরাক, ইয়েমেন, কাশ্মীরে ধর্মের বলি হচ্ছে হাজারো শিশু। ধর্মের কথা বলে অধর্মের কাজ করা পৈশাচিক। সুতরাং মনে করি, এমন সন্ত্রাসী ধার্মীকের প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন মানবিক মানুষের। তাহলেই কেবল শান্তি ফিরে আসবে ঘরে, বাইরে এবং সর্বত্র। আর নির্মম হত্যার শিকার হতে হবে না রাসেল আর জায়ানের মতো শিশুকে। মনে রাখতে হবে, ধর্ম ধর্মের জায়গায়, আর মানবতা সব জায়গায়। আগে মানুষ হই, ধার্মিকতা আপনা আপনি আসবে। 

লেখক:
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, আন্দোলন৭১ ডটকম। (hakimmahi2017@gmail.com)