টেকনাফ বাদ, ইয়াবা পাচারে নিরাপদ এখন কুয়াকাটা

image

গোফরান পলাশ-

পর্যটন নগরী কুয়াকাটা সংলগ্ন দক্ষিণ বঙ্গোপসাগর এখন চোরাকারবারীদের নিরাপদ অভয়ারণ্য। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত ও মিয়ানমার থেকে সমুদ্র পথে শিশু খাদ্য, ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী, জামা-ফ্রক, শাড়ী-থ্রিপিচ, মদ, গাঁজাসহ ইয়াবা পাচারের একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে কুয়াকাটা ও এর পার্শ্ববর্তী সমুদ্র উপকূলে।

যদিও কালে ভদ্রে আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ৭ লাখ পিচ, ৫ লাখ পিচ, ৩২৪ বস্তার ভারতীয় জামা-ফ্রক, শাড়ী-থ্রিপিচসহ পাচারকারী চক্রের চুনোপুটিরা ধরা পড়লেও অন্ধকারেই থেকে যাচ্ছে রাঘব বোয়ালরা। এমনকি চাঞ্চল্যকর এসব মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালত গ্রেফতারকৃতদের একাধিকবার রিমান্ড মঞ্জুর করলেও রহস্যজনক কারণে আদালতে দেয়া ফৌজদারী কার্যবিধির ১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে আসছেনা কোন গুরুত্বপূর্ন তথ্য। এরপর কিছুদিন হাজতবাসের পর জামিনে বেরিয়ে ফের সক্রিয় হয়ে উঠছে এসব চক্রের সদস্যরা।

কিন্তু জানা যাচ্ছেনা পাচারকারী চক্রের গড ফাদারদের নাম। অথচ নেপথ্যে থাকা গডফাদারদের জোরদার তদ্বিরে একসময় হিমাগারে চলে যাচ্ছে এসব মামলা। এরপরও ইয়াবা-গাঁজাসহ প্রতিদিন ধরা পড়ছে বিক্রেতারা। আদালতে মামলার বিচারে সশ্রম কিংবা বিনাশ্রম কারাদন্ড হচ্ছে মাদক বিক্রেতাদের, সবসময় পার পেয়ে যাচ্ছে নেপথ্যে থাকা গড ফাদাররা।

জানা যায়, ২০১৮ সালের ৬ অক্টোবর সকালে কুয়াকাটা মহাসড়কের শেখ কামাল সেতুর টোল পয়েন্ট থেকে ছয় লাখ ৭৭ হাজার ৫৬ পিস ইয়াবা, প্রাইভেট কার, একটি বিদেশী পিস্তল, দুইটি ম্যাগজিন, চার রাউন্ড গুলি, চারটি মোবাইল সেট, চারটি সীমকার্ড ও নগদ ১৯৭৫ টাকাসহ র‌্যাব-৮ বরিশাল সদস্যরা রোহিঙ্গা আলমসহ তার সহযোগী টেকনাফের ইব্রাহিমকে আটক করে। এরপর মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ ও অস্ত্র আইনে পৃথক দুইটি মামলা করা হয় কলাপাড়া থানায়। অস্ত্র আইনের মামলার চার্জশীট ইতোমধ্যে আদালতে জমা পড়লেও ইয়াবা মামলার চার্জশীট ৬ মাস পরও জমা পড়েনি আদালতে। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা দু’বার বদল করা হলেও গুরুত্বপূর্ন কোন তথ্য জানা যায়নি এখনো।

শুধু রোহিঙ্গা আলমের সরবরাহকৃত ঠিকানার অস্তিত্ব মেলেনি বাংলাদেশে। সমাধান মেলেনি ইয়াবার এ চালান সমুদ্র পথে এসে আলীপুর মৎস্যবন্দরে কার মৎস্য আড়তে আনলোড হল? এর নেপথ্যের গডফাদার কারা ছিলো? এসব প্রশ্নের।

২০১৯ সালের ৯ এপ্রিল বিকাল ৪:৩০ মিনিটের দিকে কুয়াকাটার ৫০/৬০ কি.মি. দক্ষিণ বঙ্গোপসাগরের সোনারচর এলাকায় দু’টি মাছধরা ট্রলারে থাকা ৫ লাখ পিচ ইয়াবাসহ মোশারেফ (৫০) ও টিপু শিকদার (৩০) নামের দু’জন ইয়াবা ব্যবসায়ীকে কোষ্টগার্ড পায়রা বন্দর, নিজামপুর ও ভোলা কন্টিনজেন্ট যৌথ অভিযান চালিয়ে আটক করে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা করা হয় মহিপুর থানায়, যাতে টিপুর নাম নেই।

এরপর তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তার আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালত গ্রেফতারকৃতদের রিমান্ড মঞ্জুর করলেও গুরুত্বপূর্ন কোন তথ্য আসেনি ১৬৪ ধারায় প্রদত্ত জবানবন্দিতে। ইয়াবার সাথে সংশ্লিষ্ট মহিপুর মৎস্যবন্দরের অপর আসামিদের গ্রেফতারে কোন তৎপরতা নেই পুলিশের। মাছের ব্যবসার আড়ালে কুয়াকাটা, মহিপুর ও আলীপুর মৎস্যবন্দরের কোন কোন প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা-জনপ্রতিনিধি ইয়াবা ব্যবসার সাথে জড়িত পুলিশের তদন্তে এখনো বের করা যায়নি তাদের নাম।

২০১৯ সালের ২৪ এপ্রিল গভীর রাতে কুয়াকাটা সংলগ্ন দক্ষিণ বঙ্গোপসাগরে অভিযান চালিয়ে এফ.বি. মুন্সিগঞ্জ নামের একটি বলগেট থেকে ৬ কোটি টাকা মূল্যের ৩২৪ বস্তা ভারতীয় শাড়ী ও থ্রি-পিস আটক করা হয়। একইসাথে বিভিন্ন জেলার সংঘবদ্ধ চোরাকারবারী চক্রের সক্রিয় সদস্য সবুজ (৩৫), অজিয়র রহমান (৪০), মো. লিটন (৩৫), জাহিদুল ইসলাম (২৫), বেলাল মিয়া ( ৩০), আলী মিয়া (২৩), আরিফ হোসেন (২৮), শহিদ হোসেন (৩০), আলামিন (২৪), ও মন্টু মিয়া (৪০) কে আটক করে কোষ্ট গার্ড।

এরপর কোষ্টগার্ড নিজামপুর ষ্টেশনের পেটি অফিসার মো. ইউসুফ আলী বাদী হয়ে বিশেষ ক্ষমতা আইনে মহিপুর থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মূল হোতাদের বের করাসহ তদন্তের স্বার্থে আদালতের অনুমতিতে ৫ দিনের রিমান্ডে নেন আসামিদের। কিন্তু ১৬৪ ধারায় প্রদত্ত জবানবন্দিতে পাওয়া যায়নি কোন গুরুত্বপূর্ন তথ্য।

চাঞ্চল্যকর এসকল মামলার তদন্তের অগ্রগতি জানতে তদন্তকারী কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ করেও কোন তথ্যের সহযোগিতা পাওয়া যায়নি। উল্টো এসব মামলা নিয়ে রিপোর্ট করা থেকে বিরত থাকার অনুরোধ করেন তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তা।

এর আগে ২০১৭ সালে ১ জুন আলীপুর মৎস্যবন্দরের এক প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা ও জনপ্রতিনিধির ট্রলারে মাঝি সৈয়দ হোসেনের স্ত্রী ফাতেমা আক্তার কয়েক হাজার পিচ ইয়াবাসহ আটক হলেও রহস্যজনক কারণে ইয়াবার উৎস্য, সরবরাহ ও নিয়ন্ত্রণের সাথে কারা জড়িত তাদের নাম উঠে আসেনি চার্জশীটে।

অবস্থা এমন যেন মোটা অংকের লেনদেনে অন্ধকারেই থেকে যাচ্ছে সব।

এদিকে কলাপাড়া সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতের এখতিয়ারভুক্ত পরিমাণের মামলাগুলো বিচার হচ্ছে এ আদালতে। এখতিয়ার বহির্ভূত পরিমাণের মামলাগুলো বিচারের জন্য চলে যাচ্ছে উচ্চ আদালতে। তন্মধ্যেও ২৫০টি মামলা রয়েছে জিআর শাখায় এবং প্রায় তিন শতাধিক মামলা রয়েছে বিচার ফাইলে। যা স্বাক্ষী, জেরা, যুক্তিতর্ক ও রায়ের জন্য রয়েছে। এরপরও প্রতিদিন ইয়াবাসহ গ্রেফতার হচ্ছে বিক্রেতারা আর গডফাদাররা রয়ে যাচ্ছে ধরা ছোঁয়ার বাইরে।

কলাপাড়া থানার ওসি মো: মনিরুল ইসলাম ও মহিপুর থানার ওসি মো: সাইদুল ইসলাম জানান, মাদকের বিষয়ে পুলিশ জিরো টলারেন্স। মাদক নির্মূলে নিরলসভাবে কাজ করছে পুলিশ।

আন্দোলন৭১/এস