ডাকসু নির্বাচন ও অক্সফোর্ড ছাত্র সংসদ

image

আবদুল হাকিম- 

‘বিশ্বের সবচেয়ে নামীদামী বিশ্ববিদ্যালয় অক্সফোর্ডের ইতিহাসে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে  আনিশা ফারুক ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। সে সর্বমোট ৪৭৯২ ভোটে জয়ী হন’। এই খবরটি বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতির জন্য যেমন আনন্দের, তেমন শিক্ষণীয়ও। আনন্দের হলো, বাংলাদেশের মতো একটি ছোট্ট ও উন্নয়নশীল দেশের একজন মেয়ে বিশ্বের মোড়ল ইংল্যান্ডের মতো দেশের কেন্দ্রীয় ছাত্ররাজনীতি পরিচালনা করবেন এর চেয়ে আনন্দের আর কী হতে পারে! আর শিক্ষণীয় বলতে, পেশি শক্তি, অর্থের শক্তি, মামা, চাচা বা বাবার শক্তি, দলীয় শক্তি বা সরকারি শক্তি ছাড়াই সে নির্বাচিত হয়েছেন। তবে হ্যাঁ, শক্তি একটা ছিলো, সেটা আসলে জ্ঞানের, বুদ্ধির, বিবেকের এবং কৌশলের শক্তি। মনে করা হয়, এই বিশ্ববিদ্যালয়টি সবচেয়ে প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি। এটি ১০৯৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বিশ্বে যতগুলো বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে, তার মধ্যে শিক্ষাদীক্ষা ও সভ্যতায় প্রথম (টাইমস হায়ার এডুকেশন, যুক্তরাজ্য)। নোবেল পুরস্কার শুরু হওয়ার পর থেকে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬৯ জন শিক্ষক-শিক্ষার্থী নোবেলজয়ী হয়েছেন। আরও কতো কী! এখানে নিয়মানুযায়ী ভোট হচ্ছে, মেধার যোগ্যতায় ক্ষমতায়ন হচ্ছে।

আমাদের দেশের সবচেয়ে নামীদামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। যেটি বিশ্বের মানসম্পন্ন ১০০০ হাজার বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে নেই, একটি মহাদেশ এশিয়ার ১০০টি নামীদামী বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায়ও জায়গা হয়নি যার। অনেকেই বলে থাকেন, এই বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি প্রান্ত জাতীয় জাদুঘরের সামনে থেকে পলাশীর মোড় পর্যন্ত কেউ যদি হেঁটে যান, তাহলে নাকি অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে চার বছর পড়ে অনার্স করার সমান জ্ঞানার্জন করে ফেলেন। কথাটা একধরনের রূপ কথার মতো। আমি আসলে দীর্ঘ ১১বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘুরে দেখেছি, এখানে ইট, বালি, সিমেন্ট আর ময়লা আবর্জনা ছাড়া কিছুই চোখে পড়েনি।  আর যে মানুষগুলো রয়েছেন, তাঁদের মধ্যে বেশিরভাগই হিংসুটে, স্বার্থবাদী এবং বিকৃত মনষ্কের অধিকারী। দু'একজন ভালো মানুষ থাকলেও খারাপের দাপটে পিষ্ট। যেখানে গণরুমের ফাঁদে পড়ে ছাত্রের মৃত্যু হয়, র‍্যাগিং এর ফাঁদে পড়ে শিক্ষাজীবন ধ্বংস হয়, সিনিয়র-জুনিয়রের শাসনের ফাঁদে পড়ে শিক্ষার্থীর জীবন চলে যায়, জাতীয় রাজনীতির ফাঁদে পড়ে সন্ত্রাসী হয়, ভুলে যায় শিক্ষার্থী ভ্রাতৃত্ববোধ, গুরুজনের প্রতি অসম্মান, ডাকসু’র নামে ভোট ছিনতাই, পেশি শক্তি, অস্ত্র শক্তির ব্যবহার, অন্যের মতামতের প্রতি অশ্রদ্ধা, আরও অনেক কিছু। এহেন নৈরাজ্যবাদ, একটি দেশের ভাবমুর্তি বিনির্মানে সবচেয়ে বড় অন্তরায়। 

আজ বহুল প্রতিক্ষিত ২৮ বছর পর আমাদের এই ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। যেখানে নিয়মানুযায়ী প্রতিবছর এই নির্বাচন হওয়ার কথা। কারা এই নির্বাচন পেছালো এবং কেনো পেছালো? এই প্রশ্নের উত্তর গোপনই থেকে গেলো। অনিয়মের অভিযোগ তুলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচন বর্জন করেছে ছাত্রলীগ সমর্থিত প্যানেল ছাড়া প্রায় সব প্যানেল। কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের জোট, বামপন্থি ছাত্র সংগঠনগুলোর জোট প্রগতিশীল ছাত্র ঐক্য, স্বাধিকার স্বতন্ত্র পরিষদ, স্বতন্ত্র জোট সমর্থিত, ছাত্র ফেডারেশন, ছাত্রদল ও ধর্মীয় দল সমর্থিত প্যানেল (বাংলা নিউজ)। এতো প্রতীক্ষিত নির্বাচনে অংশ নিয়ে কেনো তারা শেষ সময়ে বর্জন করলেন? পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে এখানেও বিভিন্ন প্রকারের সন্ত্রাস ও মারাত্মক অনিয়ম হয়েছে, যেগুলো আজ ১১ মার্চ সারাদিন ভোটকেন্দ্রগুলো থেকে সোশ্যাল গণমাধ্যমসহ সকল টেলিভিশন ও পত্রিকা প্রচার ও প্রকাশ করেছে। 

কোন দল অন্যায় করেছে, আর কোন দল অন্যায় করেনি আমার এটা আলোচনার বিষয় নয়। আমার বিষয় ভোট সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। অক্সফোর্ডের মতো নিরপেক্ষ ও মেধার ভিত্তিতে নির্বাচন হয়নি। তাহলে আনিশার মতো অভিযোগ ছাড়া সবার মুখেই হাসি থাকতো। আসলে হয়েছে কি, আমাদের সরিষার বীজের মধ্যেই রস নেই, তেল বের হবে কীভাবে? আমাদের যারা একাডেমিক শিক্ষা দিবেন, রাজনৈতিক শিক্ষা দিবেন, নম্রতা, ভদ্রতা, শিষ্টাচারিতা শেখাবেন, তাঁদের মধ্যেই এই উপাদানগুলো নেই, কে শেখাবেন? 

একটা প্রশ্ন হতে পারে, অনেক শিক্ষক, রাজনীতিক, প্রকৌশলী উন্নত বিশ্ব থেকে এগুলো শিখে আসেন, দেখে আসেন বা এরাও ঐ দেশে গিয়ে সুনামের সাথে কাজ করেন। কিন্তু যখন তাঁরা ঐ দেশ থেকে বিমানে এসে নামেন, তখনই তাঁরা কীভাবে বেইমান হয়ে যান, স্বার্থপর হয়ে যান? এই প্রশ্নটা আমারও। আমার মনে হয়, ব্রিটিশ আমলসহ যুগে যুগে মির্জাফরের মতো অনেক বেইমানের জন্ম আমাদের এই ভূখণ্ডে, ঐ রক্ত এখনও আমাদের শরীরে আছে, যে জন্য আমরা বিদেশে যতই ভালো করি, দেশে আসার সাথে সাথে বেইমান, স্বার্থপর হয়ে যাই। তবে, একটা কথা মনে রাখা প্রয়োজন, এই দেশের জন্মলগ্ন থেকেই কোন বেইমানকে এই দেশের মানুষ ক্ষমা করেনি, আর করবেও না। দেশের বিশ্বাসঘাতকদের বিচার হবেই হবে। বাঙালি করবেই করবে।

দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় যখন রাষ্টীয় সন্ত্রাস প্রবেশ করে, তখন আর শিক্ষার্থীদের থেকে মেধা আশা করা যায় না। ছাত্ররাজনীতি ছাত্র-শিক্ষকদের মাঝেই সীমাবদ্ধ রাখা উচিৎ। যখন শিক্ষার্থীরা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ট-পোষকতা পায়, তখন তাঁরা বন্য হয়ে ওঠে। ছাত্র সংসদ হবে ছাত্রদের প্রয়োজনে, ছাত্রদের কল্যাণে। এখানে জাতীয় রাজনীতির ব্যবহার অপ্রয়োজনীয় এবং সাথে সাথে আক্রমণাত্মক। আর যেটি ডাকসু নির্বাচন থেকে দেশের সকল ছাত্ররাজনীতিতে প্রকাশ্যে দেখা যায়। একসময় এই ছাত্ররাই সমতার রাজনীতির চর্চা করতে করতে দেশের পিছিয়ে পড়া, ঘুণে ধরা রাজনীতির কাণ্ডারি হবে। তখন দেশ থাকবে শিক্ষিতদের, মেধাবীদের হাতে। বিশ্ব রাজনীতি ও শিক্ষাব্যবস্থা তখন অবাক চোখে বাংলাদেশের দিকে তাকিয়ে থাকবে। শিক্ষা নিবে এই ছোট্ট সোনার দেশের সকল কর্মকাণ্ড থেকে। উদাহরণ দিবে বিশ্ব নেতারা।


লেখক: সম্পাদক, আন্দোলন৭১ নিউজ। (editor.andolon71@gmail.com) 

আন্দোলন৭১/এইচএম