মঙ্গলবার,৪ আগস্ট, ২০২০ অপরাহ্ন

তবে কি হারিয়ে যাচ্ছে বিটিভি ?

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৯ মে, ২০১৯ ০৪ ১৭

আশরাফি দিবা- 

সেদিন সন্ধ্যায় অফিস থেকে বাসায় ফিরে দেখি আমার ছোট বোন ট্যাবে ইউটিউবে দেখছে।আমি ফ্রেস হয়ে এসে ওকে ডেকে বললামচলো একসাথে বসে টিভি দেখি। উওরে বললোনা টিভিতে দেখার মত কিছু হয় না। আমার ভালো লাগে নাতুমি দেখো।

আমার বোনের উত্তরে আমার কিছুটা মন খারাপ হলো।খানিক বাদে মনে পড়ে গেলো আমার ছেলেবেলার কথা।

আমার শৈশব কেটেছে গ্রামে।সে সময় আমাদের পুরো গ্রামে মাত্র দু-এক বাড়িতে টেলিভিশন ছিল।কিন্তু দর্শক ছিলো অগণিত।যে বাড়িতে টিভি থাকতো প্রতিদিন একটা নির্দিষ্ট সময়ে সে বাড়িতে সবার সমাগম হতো। ঐ সময়টায় বাড়ির উঠানে অ্যান্টেনা লাগানো থাকতো। অ্যান্টেনা নেড়ে-চেড়ে শুধু বাংলাদেশ টেলিভিশন বা বিটিভি চ্যানেলটিই দেখা যেতো।

কিন্তু এখন সবাই এই চ্যানেলের নাম শুনলে পরিহাস করে। বর্তমানে আকাশ সংস্কৃতির যুগে কেউ আদৌ বিটিভি দেখে কিনা সন্দিহান। কিন্তু আমাদের সময়টায় বিনোদনের জন্য এই বিটিভিই ছিলো। তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে চ্যানেল একটি থাকলেও এখনকার তুলনায় দর্শক ছিল অনেক বেশি।

ওই সময়টাতে বিটিভেতে আলিফ লায়লাসিন্দবাদআলিবাবা চল্লিশ চোরম্যাগগাইভারমিনা কার্টুনের মতো অসাধারণ অনুষ্ঠান প্রচারিত হতো। সপ্তাহে সাতটা দিন সবাই অধির আগ্রহে অপেক্ষা করে থাকত এই অনুষ্ঠান দেখার জন্য।

আমার এখনো মনে পড়েশুক্রবার দুপুরে পূর্ণদৈঘ্য বাংলা ছায়াছবি প্রচারিত হতো। সবার কী আগ্রহ, আজ কোন নায়ক-নায়িকার সিনেমা প্রচারিত হবে শাবানা-আলমগীর না মান্না-মৌসুমি নাকি সালমান শাহ-শাবনুরের। এইদিন  আমাদের বাড়ির উঠানে টিভি প্রদর্শিত  হতোকারণ এত মানুষ টিভি দেখতে আসত যে, ঘরের ভেতরে জায়গা দেওয়া যেত না।


সবাই উঠানে পাটি পেতে বসে দেখত।একটা সিনেমার মধ্য অসংখ্য বিজ্ঞাপন প্রচার করা হত, কিন্তু বিরক্ত না হয়ে আগ্রহ নিয়ে বসে থাকত সবাই।এখানেই শেষ নয়সিনেমা শেষেও সেটা নিয়ে নিজেদের মধ্য চলত আলাপ আলোচনা।

শুক্রবার সন্ধ্যায়তেই আবার শুরু হতো আলিফ-লায়লা। টিভির পর্দায় যখন আলিফ লায়লাআলিফ লায়লাআলিফ লায়য়য়য়য়য়য়লা… বেজে উঠত সবার মনের মধ্যে বেড়ে উঠতো উওেজনা। তেইশ মিনিটের আরব্য রজনীর গল্পগুলো মন ছুঁয়ে যেত সবার।


মনে পড়ে আল্লাহর একজন সৎ বান্দা এবং পরোপকারী ব্যক্তি সিন্দাবাদের কথা।যিনি বাগদাদের একজন বিখ্যাত সওদাগ ছিলেন।তার  সাতবার সমুদ্রযাত্রা অচেনা সাগরের বুকে ভেসে বেড়ানোকখনো ঝড় আবার কখনো দৈত্যের কবল থেকে নিজেকে রক্ষা করা এসব অসাধারণ গল্প শিহরিত করত সবাইকে।


দুপুরে শুরু হতো মিনা কার্টুন। প্রতিদিন নতুন নতুন গল্পে হাজির হতো মিনা, রাজু আর মিঠু। কী আগ্রহ নিয়ে যে টিভির সামনে বসে থাকতাম সে অনুভূতি বলে বোঝাতে পারবো না।


এগুলো ছাড়াও আজ রবিবারকোথাও কেউ নেইবহুব্রীহির মত অসংখ্য কালজয়ী নাটক প্রচারিত হত সেসময়ে।

মনে পড়েকোথাও কেউ নেই নাটকের মতি মিয়ার কথা।সে সময়ে মতি মিয়ার মতো সাজ পোশাক আয়ত্ত করার চেষ্টা করত অনেকে। মতি মিয়ার যেদিন ফাসি হয়েছিল সেদিন বিষন্নতা ছড়িয়েছিল সব গ্রামে শহরে।


আরও মনে পড়েআজ রবিবারের কংকা,বড় চাচা,বাবা,তিতলির কথা। মনে পড়হানিফ সংকেতের অসাধারণ উপস্থাপনায় ইত্যাদি অনুষ্ঠানের কথা। শীতের ভেতরে চাদর মুড়ি দিয়ে উঠানে সবাই বসে মিলে এই অনুষ্ঠান দেখার আনন্দ ছিল অন্যরকম।


এখন টিভিতে অসংখ্য চ্যানেল এসেছে।এখন আর অ্যান্টেনা ঘোরাতে হয়না। এক জায়গা বসেই চ্যানেল পরিবর্তন করা যায়।কিন্তু এখন আর সেই  আমেজটা নেই।বাসার সবাই মিলে সপ্তাহ কেন, মাসেও একদিন বসে টিভি দেখা হয় কিনা মনে পড়ে না আমার। গ্রামেও এখন প্রতিটি বাড়িতে টিভি।কেউ আর টিভি দেখতে কারো বাড়ির উঠানে যেয়ে বসে থাকে না কিংবা জানালা দিয়ে উঁকিও দেয়না।

সময় বদলেছেবদলে গিয়েছে সবকিছু। নতুন প্রযুক্তিতে নতুন প্রজন্ম খুঁজে নিয়েছে তাদের বিনোদনের উৎস। কিন্তু আজও আমি খুঁজে ফিরি আমার সেই শৈশবকেখুঁজি সেই অসাধারণ অনুষ্ঠানগুলোকেখুঁজি সেই বিটিভি কে যা আমার শৈশবকে করে তুলেছে স্মৃতিময়।

আন্দোলন৭১/এডি 

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2018 Andolon71
Theme Developed BY Rokonuddin