ঢাকা মঙ্গলবার,১৭,সেপ্টেম্বর, ২০১৯

তানজিমা'র যে ছবি নারীদের সম্ভাবনার কথা বলে

image

আবদুল হাকিম- 

‘ছবি কথা বলে’ এ কথাটি যতই পুরাতন হোক সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে এর অর্থের বিস্তৃতি। ১৫০৩ সালের লেওনার্দো দা ভিঞ্চির মোনালিসা ছবি, জয়নুল আবেদিনের দুর্ভিক্ষের ছবি আজও নাড়িয়ে দেয় বিশ্বকে। নভেরার সিমেন্টে মোড়ানো পরিবারকে নিয়ে নীরব প্রতিবাদের ভাস্কর্য জ্ঞানচোখ খুলে দেয় ভাবুক চিন্তাশীলদের। তেমনি তানজিমা ইসলামের ‘নারীদের হাতের মুঠোয় থাকুক এই বিশ্ব’ শিরোনামে ছবিটি পৃথিবীর অবহেলিত, নিপীড়িত ও পুরুষতান্ত্রিক আগ্রাসনে পিষ্ট নারীদের সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেবে বলে মনে হচ্ছে।

গুরুজি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস যথার্থই বলেন, তিনি যখন তাঁর ক্লাসের শিক্ষার্থীদের জেন্ডার (লিঙ্গ) সচেতনতা নিয়ে এমন প্রশ্ন করেন, ‘সে ভাত খায়’ এর ইংরেজি অনুবাদ কি? শিক্ষার্থীরা বলেন, হি ইটস রাইস’। এটি নির্ভুল অনুবাদ হলেও মি. ফেরদৌসকে লিঙ্গ বৈষম্য নিয়ে ভাবায়। শুধু যে ছেলেরা এই উত্তর দেয় এমন না, মেয়ে শিক্ষার্থীরাও একই উত্তর দেন। কারণ, হাজার হাজার বছরের পুরুষতান্ত্রিক আগ্রাসন মানুষের মগজ থেকে নারীবাদকে ধুয়ে মুছে দিয়েছে। এই জন্য ‘শি ইটস রাইস’ এর ‘শি’ এর ব্যবহার পৃথিবীর কোন বইতে মনে হয় নেই। তবে, নারী বোঝানোর জন্য 'শি' এর ব্যবহার রয়েছে। অক্সফোর্ড, ক্যামব্রিজ বা বাংলা একাডেমির ডিকশনারিতেও নেই। কারণ, লিঙ্গের প্রশ্ন আসলেই মানুষের মাথায় পুরুষতন্ত্রের ছবি ভেসে ওঠে। এটি ভুল নয়, অন্যায় আর চর্চার ফল।

এখন যদি প্রশ্ন করা হয় ‘সে (হিজড়া) ভাত খায়’ এর ইংরেজি বাংলা আরও দূর্বোধ্য ও দুষ্প্রাপ্য। আরও আবিষ্কারই হয়নি হিজড়াদের সর্বনাম। কেন হয় নি, এই বিজ্ঞানের ও অত্যাধুনিকতার যুগে। কারণ, হিজড়াবাদ/হিজড়াতন্ত্র নামক কোন তন্ত্র আজও আবিষ্কারই হয়নি। ‘হি’ ও ‘শি’ থাকাতে ‘সে ভাত খায়’ প্রশ্ন করলে দু/একজন জিজ্ঞাসা করেন ‘সে’ কি পুরুষ-নাকি নারী’। মনে হচ্ছে, হি-শি থাকাতে বর্ণবাদের সৃষ্টি হয়েছে। যদি ধরি, ‘হি-শি মানুষ’ এরা ভাত খায়। তাহলে, ‘মানুষ’ শব্দের যদি সর্বনাম থাকতো এই ‘হি, শি বা হিজড়ার’ প্রশ্নগুলো মানুষের মাথায় আসতো না।  আর শুধু একটি তন্ত্র আছে, সেটি হলো ‘পুরুষতন্ত্র’। মানুষতন্ত্র থাকলে হয়তো নারীবাদ, হিজড়াবাদ ব্যাকরণ থেকে বাদ পড়তো না।

রাজধানীর একটি স্কুলের ৮ম শ্রেণির শিক্ষার্থী তানজিমা ইসলাম। তাঁর বাবা ড. শেখ শফিউল ইসলাম ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক। তানজিমা’র পেন্সিলে আঁকা ছবিটিতে দেখা যায় একজন চঞ্চল কিশোরী মেয়ে পৃথিবীর মানচিত্রকে হাতের উপরে রেখে দাঁড়িয়ে আছেন। যেনো পৃথিবীর সকল প্রান্ত মেয়েটির চোখ দর্পণে। কোন ভাস্কর বা আবিস্কার কর্তা যেমন তার সৃষ্টিশীল বস্তুর আদ্যপান্ত পর্যবেক্ষন করতে পারেন, তেমনি মেয়েটি তার হাতের মুঠোয় বিশ্বকে রেখে পর্যবেক্ষন করছেন। ‘নারীদের হাতের মুঠোয় থাকুক এই বিশ্ব’ ছবির শিরোনাম নারীদের শক্তিশালী ভবিষ্যৎ বলে দেয়। এই গতিশীল চিত্রকর্মটিও পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে তানজিমার নীরব প্রতিবাদ। এটির মাধ্যমে সে চান নারীরা জেগে উঠুক, নারীর চোখে আগামীর বিশ্ব দেখুক, নারীর কণ্ঠে গেয়ে উঠুক সম্ভাবনার জয়গান। ধীরে ধীরে বিশ্বব্যাপী নারীদের যে অর্জন, তানজিমার দূরদর্শিতাকে নারীবাদের দৃষ্টি থেকে সেই স্বীকৃতি দেয়।

লেখক: ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, আন্দোলন৭১ ডটকম।