ঢাকা শুক্রবার,২০,সেপ্টেম্বর, ২০১৯

ধর্ষক এবং দর্শক

image

আশরাফি দিবা-

সামাজিক বিজ্ঞানীরা অনেক আগেই বহুবার বলেছেন, মানুষ যেভাবে বেড়ে উঠে তার মন মানসিকতা সে ভাবেই বৃদ্ধি পায়। যেমন ধরুন, টারজান বা মুগলীর ঘটনা।ঘটনা কাল্পনিক হলেও, এর মাধ্যমে বুঝনো হয়েছে, মানুষ যদি বনে জংগলে থাকে তাহলে তার আচরণও পশুর ন্যায় হবে।

কিন্তু সমাজে যখন পাপ কে বিলাসিতা মনে করা হয়, তখন এর দ্বায় কি সমাজের, নাকি মানুষের নিজের? যদি দ্বায় সমাজের হয়, তাহলে ‘পাপ কে নয় পাপীকে ঘৃণা করো’। আর যদি ব্যক্তির নিজের দ্বায় থাকে তাহলে ‘পাপীকে সর্বোচ্চ শাস্তি দাও’। এই নীতিতেই আমরা ভরসা করি।শাস্তি নিয়েও আবার বিতর্ক রয়েছে বিস্তর।কেও বা শাস্তি নিয়ে মানবিকতার দলে আছেন। তারা বলেন, এতো কঠোর শাস্তি যেন না দেয়া হয়।আবার কেও বা বলছেন শাস্তির ক্ষেত্রে কোন মানবিকতা দেখানো হবেনা। কিন্ত আমার প্রশ্ন হচ্ছে ধর্ষণের মতো অপরাধের শাস্তিতে কি মানবতা কাজ করবে? আর ধর্ষকের ক্ষেত্রে কী প্রযোজ্য হবে ?। পাপীকে নয় পাপকে ঘৃণা করো। না হলে সর্বোচ্চ শাস্তি দিতে হবে। শাস্তি বা বিচার এসব আদালতের বিবেচনা। এই নিয়ে সাধারণ জনগণের মাথা ঘামানোর কারন নেই।

কিন্ত, তাই বলে অপরাধ যদি শাস্তির আওতায় না আসে, সেটা অবশ্যই মাথা ঘামানোর প্রয়োজন আছে।ধর্ষক তার মানবিক চিন্তা চেতনা কীভাবে বৃদ্ধি করেছেন সেটা চিন্তার বিষয়।নিশ্চয় সামাজিক বিজ্ঞানীদের তথ্যানুযায়ী ধর্ষকেরা বেড়ে উঠেন অসামাজি কভাবে।কারণ, সামাজিক জীব হিসেবে সামাজিক ভাবে বেড়ে উঠা মানুষ নিশ্চয় ধর্ষক হতে পারেনা।মাঝে মাঝে হাস্যকর হলেও মনে হয়, টারজান বা মুগলির মতো বনে জংগলে বেড়ে উঠলে হয়তো মানুষ ধর্ষনের স্বীকার হতো না, বা এতো অসামাজিক কার্যকলাপও হতো না।কেও বলছেন দেশে ধর্ষনের শাস্তি হয় না বলেই ধর্ষক বেড়ে যাচ্ছে, আবার কেও বলছেন আধুনিকতাই ধর্ষনের কারণ।তবে আমি প্রথমটাকেই প্রবল সমর্থন করি।বাংলাদেশের মতো দেশে যেখানে জন্মের আগেই মা-বাবা স্বপ্ন দেখেন ‘আমার ছেলে/মেয়ে ডাক্তার হবে বা ইঞ্জিনিয়ার হবে’।সেদেশের বাবা মা নিশ্চয় চিন্তাও করেন না ‘আমার ছেলে/মেয়ে ধর্ষক হবে’! এমনকি একজন অপরাধী বাবাও এই চিন্তা মাথায় আনবেন না।বাবা মা যেহেতু চায় সন্তান মানুষ হোক, এবং সেভাবেই পরিকল্পনা করে যেন সন্তান মানুষের মতো মানুষ হয়, তাহলে এতো ধর্ষণ কেন এদেশে? যেখানে বাবা নিজের মেয়েকে ধর্ষণ করছে, আপন ভাই তার ছোট বোনকে ধর্ষণ করছে। সদ্য পৃথিবীর আলো দেখা শিশুটিও বাদ পরছেনা ধর্ষকের থাবা থেকে।

এখানে দ্বায়টা কার? সমাজের, পরিবারের, রাষ্ট্রের নাকি ব্যক্তি তার নিজের? একটু পরিসংখ্যান ঘাটলেও চোখ ছানাবড়া হবে।চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত ৩৯৬জন নারী-শিশু হত্যা, ধর্ষণ ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।খোদ পুলিশ সদর দফতরের পরিসংখ্যান বলছে, সারাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমনের মামলা হয়েছে ১ হাজার ১৩৯ টি এবং হত্যা মামলা হয়েছে ৩৫১টি।বেসরকারি সংগঠন মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি মাসের প্রথম ১৫ দিনে সারাদেশে ৪৭ শিশু ধর্ষণ, ধর্ষণ চেষ্টা ও যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে। ৪৭ শিশুর মধ্যে ধর্ষণের শিকার ৩৯ জন।এই তথ্য গুলো বিবেচনা করা হয়েছে ধর্ষনের শিকার হওয়া মামলার বা অভিযোগের ভিত্তিতে।এই পরিসংখ্যানের বাইরে কতো নারী বা শিশু মুখ খোলেন না তার কোন পরিসংখ্যান নেই।

দেশে ধর্ষনের শিকার হচ্ছে কিন্ত বিচারের আওতায় সঠিকভাবে আসছেনা।বিচারে যেসব শাস্তি দেয়া হচ্ছে, সেটাও সমাজ মেনে নিতে পারছেনা।বিশ্বে বিভিন্ন দেশে ধর্ষণের শাস্তি কঠোর।কোন কোন দেশে মৃত্যুদণ্ড সর্বোচ্চ শাস্তি রয়েছে, তবে মৃত্যুদণ্ডের কার্যকর একেক দেশে একেক রকম।কিন্তু আমাদের দেশে ধর্ষকের শাস্তি ধারা ৯(২) অনুযায়ী  ‘ধর্ষণের ফলে বা ধর্ষণের পড়ে অন্য কোন কাজের ফলে ধর্ষিত নারী বা শিশুর মৃত্যু ঘটলে ধর্ষণকারী মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন সশ্রমকারাদণ্ড ভোগ করবেন। এছাড়াও তাকে এক লক্ষ টাকা অর্থ দণ্ডে দণ্ডিত করা হবে।’ ফলে একজন ধর্ষক হয় তো নিজেই জানেন তার এই পাপের শাস্তি  খুব কঠিন কিছু না।

বিশ্বে সবচেয়ে বেশি ধর্ষণের ঘটনা ঘটে আমেরিকায়। এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশটিতে ধর্ষণের শিকার নারীর পরিসংখ্যান ৯১% এবং ৮% পুরুষ।অপর একটি সমীক্ষায় দেখা যায়,  দেশেটিতে ছয় জন নারীর মধ্যে একজন ধর্ষণের শিকার।পুরুষদের ক্ষেত্রে পরিসংখ্যানটা ৩৩ জনে ১ জন ধর্ষণের শিকার। দেশেটিতে ১৪ বছর বয়স থেকেই ধর্ষণের মত অপরাধের প্রবণতা তৈরি হয় শিশুর মনে। এবং সেখানে ধর্ষণের শাস্তি মাত্র দুই বছর জেল।

২০১০ সালের তথ্যানুযায়ী আজার বাইজান বা মধ্যপ্রাচ্যে ধর্ষনের মত অপরাধ তুলনামূলক কম।আজার বাইজানে গড়ে এক লক্ষ মানুষের মধ্যে ০.৪ শতাংশ ধর্ষনের শিকার হয়েছেন। যেখানে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড।এবং জাপানে এক লক্ষ মানুষের মধ্যে মাত্র ১ শতাংশ মানুষ ধর্ষনের শিখার হয়েছেন এবং সে দেশের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। এছাড়াও সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশের কঠিন শাস্তির বিধান রয়েছে।

কিন্তু আমাদের দেশে চোখের সামনে কেও খুন হতে দেখলেও ঠেকানোর কোন বালাই নেই বরং সবাই দর্শক হয়ে মজা নেন।কেও বা ভিডিও করেন সামাজিক মাধ্যমে লাইক,শেয়ার কুড়ানোর জন্যে, কেও সাহসের অভাবে বাধা দিতে পারেন না। তাহলে সেক্ষত্রে কি তারাও অপরাধী নয়, যারা অন্যায় চোখের সামনে দেখেও দর্শক হয়ে উপভোগ করেন? এমন কি চোখের সামনে ধর্ষণ হতে দেখেও কোন বাধা দিচ্ছেন না দর্শকেরা।ধর্ষক নিঃসন্দেহে অপরাধী, কিন্তু যারা দেখেও না দেখার ভান করেন বা নিরব দর্শকের মত বিষয়গুলোকে উপভোগ করেন তারা কি অপরাধী নয়?

তার মানে আমরা  বুঝতে পারছি যে, শাস্তি যতো বেশি ধর্ষণ ততো কম। এছাড়াও সামাজিক অবক্ষয়, মাদকের বিস্তার, কর্মহীনতা, আকাশ সংস্কৃতির নেতিবাচক প্রভাব, আইনের সঠিক প্রয়োগ না থাকা, পর্নো ছবির অবাধ বিক্রি, সর্বোপরি নারীর প্রতি পুরুষের হীন দৃষ্টিভঙ্গির কারণে দিন দিন আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে নারী ও শিশু ধর্ষণের ঘটনা। ধর্ষণের সঙ্গে জড়িতরা হয়ে পড়ছে অপ্রতিরোধ্য। শিশু থেকে কিশোরী, যুবতী থেকে বৃদ্ধা, স্কুলছাত্রী থেকে পোষাক কর্মী, ডাক্তার, আইনজীবী এমন কি ভিখারিনীও রেহাই পাচ্ছেনা মানুষরূপী এসব হায়েনাদের হিংস্র থাবা থেকে।শুধু তাই নয়, ধর্ষকরা শুধু ধর্ষণ করেই ক্ষান্ত থাকছে না, ঘটনা ধামাচাপা দিতে ঘটাচ্ছে নৃশংস হত্যাকাণ্ড। শিশু ধর্ষণের ঘটনাগুলো শিশুর শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক জীবনে ফেলছে নেতিবাচক প্রভাব।

বিবিসির তথ্যানুয়াী এবং জাতিসংঘের গবেষণার ফলাফলে বলা হয়েছে, ধর্ষণের কারণ সম্পর্কে উত্তর দাতাদের মধ্যে প্রায় তিন চতুর্থাংশ (৭৩%) জানিয়েছেন,  এটাতে তাদের অধিকার রয়েছে বলে মনে করেন। প্রায় অর্ধেক (৫৯%) বলছেন, শারিরীক আনন্দের জন্যই তারা জোর করে যৌণ সঙ্গম করেছেন।আর এক তৃতীয়াংশ (৩৮%)-এর বেশি উত্তরদাতা বলেছেন, নারীকে শাস্তি দেয়ার জন্যেই তারা একাজ করেছেন।

আন্দোলন৭১/এডি