নাটক পাগল গুরু-শিষ্য

image

আবদুল হাকিম-

বিকাল ৫টা। বাইরে ঘন কালো অন্ধকার। মনে হচ্ছে দিনের বেলা নিশি রাত নেমে এসেছে শহরে। চারিদিক বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। দমকা হাওয়া রাস্তার ধুলোবালি আমাদের সিএনজির উপর বৃষ্টির ফোটার মতো ঝরঝর করে পড়ছে। গাড়িতে আমি আর আমার গুরুজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস।

দু’জনে যাচ্ছি বেইলি রোড মহিলা সমিতির অডিটোরিয়ামে নাটক দেখতে। আমাদের এতটাই নাটক দেখার ঝোঁক, বাইরে যতই বৈরি আবহাওয়া থাকুক আমাদের দমাতে পারবে না। জীবন বাজী রেখে হলেও আমারা সেখানে পৌঁছলাম। কিন্তু গিয়ে দেখি আজ সেখানে নাটক হবে না। পত্রিকার বিজ্ঞাপনে ভুল তথ্য দেওয়া হয়েছে। তাও আবার দেশের সবচেয়ে নামীদামী পত্রিকা প্রথম আলোতে। এদিকে আমাদের জন্য সেখানে অপেক্ষা করছেন শুভাকাঙ্ক্ষী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মাসুদ ভাই। অন্য একজন শুভাকাঙ্ক্ষী প্রবাসী হানিফ ভাই, তিনি ইতোমধ্যে গাড়িতে করে আমাদের সাথে যোগ দিতে আসতেছেন।  

যাইহোক, যখন শুনলাম এখানে আজ নাটক নেই, তখনই নাটক পাগল স্যার ফোন দিলেন রাজধানীর শিল্পকলায়। সেখানে এই নাটকেরই অনুবাদক আব্দুস সেলিম স্যারের আরেকটি নাটক মঞ্চস্থ হবে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায়। শুনামাত্রই আরেক সিএনজি ভাড়া করে শিল্পকলায় আমরা ৩জন চলে আসলাম। আর হানিফ ভাইকে বললাম আরেক সিএনজি নিয়ে আসতে। আমরা ৪টা টিকিট নিয়ে আশেপাশে না তাকিয়ে সোজা ৮তলায় অপেক্ষা করছি কখন নাটক শুরু হবে আর মাঝে মাঝে এটা সেটা খাচ্ছি! ইতোমধ্যে কাঁটায় কাঁটায় সাড়ে ৭টা, হানিফ ভাই এসে হাজির। আমরা সবাই শিল্পকলার অডিটোরিয়ামে প্রবেশ করেছি এক্সপেরিমেন্টাল হল মনে করে। নাটক শুরু হলো ঠিকই, কিন্তু অন্যটা। আমরা অবাক! তাহলে আমাদের নাটক কই? একজন বললেন, দাদা আপনাদের নাটক দ্বিতীয় তলায়। আবার সেখান থেকে দৌড়ে নিচে নামলাম। সেখানে গিয়ে শুনি যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে নাটক শুরু হতে সময় লাগবে। আমরাও কম নই, অপেক্ষা করতে থাকলাম।

নাটক শুরু হলো। নাটকের নাম ‘ম্যান অব লামাঞ্ছা’। এটি মূলত অনুবাদ নাটক। মূল নাটক মিগুয়েল ডি সারভান্তের সাভেদ্রা রচিত ‘ডন কিহতে’ এটি অনুবাদ করা হয়েছে। অনুবাদক সেন্ট্রাল উইমেন্স ইউনিভার্সিটি’র ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক আব্দুস সেলিম।

নাটকটি মূলত মানুষের দৈনন্দিন জীবন নিয়ে। এখানে, উপন্যাসের যে গল্পপ্রবাহ ও চরিত্র চিরিত্র তা থেকে খানিকটা সরে গিয়ে মঞ্চরূপের ধারনা থেকেই নাট্যকার এর কাহিনী নির্মাণ করেছেন। এই গল্পে সেরভানতেস সেভেদ্রা নামক একজন লেখক অভিনেতাকে ভিন্ন একটি অপরাধের দায়ে ধর্ম আদালতে হাজির হওয়ার জন্য অপেক্ষারত অবস্থায় পাওয়া যায়। সেখানে তিনি গল্প করেন একজন জমিদারের। জমিদারের নাম আলোনসো কিহানা, যিনি তাঁর মানসিক, ভারসাম্যহীনতার কারণে নিজেকে ডন কিহতে নামক একজন অকুতোভয় যোদ্ধা ভাবতে শুরু করেন। এই ডন কিহতের নানা অভিযান আর তাঁর জীবনবোধপ্রসূত বিচিত্র দৃশ্যের রুপায়ন হয় পুরো গল্প জুড়ে।

নাটকের নির্দেশক বলেন, আজকালকার মানুষের জীবনটা যেন পণ্য হয়ে বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা ছাড়া আর কিছু না-এমনই মনে হচ্ছিল। এইরকম অবস্থায় ক্লাসিল সাহিত্যিক মানুষকে আরেকবার বাঁচার প্রেরণা যোগায় সেটাও জানা ছিল। ডন কিহতে-র গল্পটা সেইরকম একটি নিঃশ্বাস নিয়ে মানুষের প্রতি বিশ্বাস এনে দিলো। মনে হলো এই গল্পটা নিয়ে নাটক হওয়া দরকার, যার সন্ধান দিলেন অনুবাদক। পাণ্ডুলিপি থেকে প্রযোজনা পর্যন্ত গিয়ে মনে হলো মগ্নতা দিয়েই নতুন সত্যের আবিষ্কার সম্ভব। মিউজিক্যাল ধারণাটি বিবেচনায় থাকলেও অভিনয়রীতিতে স্তানিস্লাভস্কি স্মরণে রাখা হয়েছে। মানুষের নিত্যদিনের কর্মকেই মূলত এই নাটকে স্থান দেওয়া হয়েছে।

অবশেষে নাটকের চরিত্র ও কোরিওগ্রাফি দেখে মনে হয়েছে যত কষ্টই হয়েছে নাটকটি দেখতে গিয়ে, তারচেয়ে বেশি স্বার্থকতা খুঁজে পাওয়া গেছে এখানে। নির্মাতার কাছে প্রত্যেকটি কাজই সন্তানের মতো। আর কাজের প্রাপ্তি হিসেবে যদি সবার হাতেতালি পাওয়া যায়, তাহলেতো আনন্দের কোন সীমা থাকে না। সত্যিই নাটকটির পেছনের ও প্রদর্শিত কাজগুলো সীমাহীন প্রশংসার দাবীদার।

আন্দোলন৭১/এইচএম/এস