নারী জাগরণের বাহক প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার

image

আকবর হোসেন রবিন-

অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে যে কৃষক বিদ্রোহগুলোর কথা আমরা জানতে পারি, তা থেকে’৭১এর মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত আমাদের সুদীর্ঘ জাতীয় মুক্তির সংগ্রামে নারীদের অবদান আলাদা করে দেখা যাবে না। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রতিটি সংগ্রামে-আন্দোলনের মধ্যেই নারীদের অবদান মিলেমিশে আছে। কখনও প্রত্যক্ষ, কখনও পরোক্ষভাবে নারীদের অংশগ্রহণ ছাড়া কোন পর্যায়ে স্বাধীনতা আন্দোলনের কোনো কর্মসূচি সফল করা যায়নি। তাঁদেরই একজন প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার। যিনি প্রীতিলতা ওয়াদ্দের নামে পরিচিত। একজন বাঙালি, যিনি ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম নারী মুক্তিযোদ্ধা ও প্রথম বিপ্লবী নারী শহীদ ব্যক্তিত্ব এবং নারী জাগরণের বাহক।

চট্টগ্রামের পটিয়ার ধলঘাটে বীরকণ্যা প্রীতিলতা প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গনে ২০০৫ সনের ২২ শে ফেব্রুয়ারী প্রতিষ্ঠিত প্রীতিলতার মূর্তি।​

প্রীতিলতা ওয়াদ্দের চট্টগ্রামের ধলঘাট গ্রামে ১৯১১ সালের ৫ মে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম জগদ্বদ্ধু ওয়াদ্দেদার ও মাতার নাম প্রতিভাময়ী দেবী। বাবা মায়ের ছয় সন্তানের মধ্যে প্রীতিলতা ছিলেন দ্বিতীয় সন্তান। ছোট বেলায়, কন্যা ও কালো বলে পরিবারের আত্মীয়রা তাকে নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করতেন। তখন প্রতিভাময়ী দেবী তাদের উদ্দেশ্যে বলতেন ‘দেখে নিও, আমার কালো মেয়ে একদিন তোমাদের সবার মুখ আলো করবে’। তিনি আদর করে মেয়ের নাম রেখেছিলেন রানি।

প্রীতিলতার অপর ভাইবোনেরা পারিবারিক গন্ডির বাইরে কেউ যেতে পারেননি। তাছাড়া তখন গড়পড়তা বাঙালি পরিবারে মেয়েদের বিশেষ পড়ানো বা স্কুলে পাঠানো হত না। প্রীতিলতার বাবাও প্রথম দিকে কন্যাদের শিক্ষার ব্যাপারে উদাসীন ছিলেন। কিন্তু প্রীতিলতার আগ্রহ দেখে তাঁকে ডা. খাস্তগীর গার্লস হাই স্কুলে ভর্তি করে দেয়া হয়। মেধাবী মেয়েটি স্কুল জীবন থেকে চেয়েছিলেন, নারীজাতির উন্নতি সাধনে মন দিতে। 

আত্মাহুতির স্থানে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগে ২০১২ সালের ২ অক্টোবর প্রীতিলতার ব্রোঞ্জমূর্তি উন্মোচিত হয়।​

চট্টগ্রাম তখন অগ্নিগর্ভ। মাস্টার দা সূর্যসেনের বৈপ্লবিক কর্মসূচির সঙ্গে অনেকেই পরিচিত। চট্টগ্রামবাসীর নীরব সমর্থন তাঁর প্রতি। প্রীতিলতা কৈশোরে মাস্টারদা ও অম্বিকা চক্রবর্তীকে বন্দি অবস্থায় একবার দেখেছিলেন। শুনেছিলেন তাঁরা স্বদেশী ডাকাত। স্কুলের এক শিক্ষিকা তাঁকে বুঝিয়ে ছিলেন স্বদেশী ডাকাত কারা, তাঁদের লক্ষ্য কী। ক্লাস এইটের মেধাবী ছাত্রীটিকে বোঝাবার জন্য পড়তে দিলেন ‘ঝাঁসির রানি লক্ষীবাঈ’। তখন থেকেই দেশের অবস্থা জানতে প্রীতিলতা নিয়মিত খবরের কাগজ পড়তে শুরু করেন।

প্রীতিলতার স্কুল জীবন শেষ হল। প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হলেও শিক্ষাবৃত্তি না পাওয়ায় কলকাতায় পড়তে যাওয়া হল না। ঢাকার ইডেন কলেজের হোস্টেলে দশ টাকায় থাকা যায় বলে তিনি সেখানেই পড়তে গেলেন। এখানে বলে রাখা ভালো, তখন চট্টগ্রামে সহশিক্ষার চল ছিল না। ঢাকায় এসে প্রীতিলতা ‘দীপালী সংঘের’ কথা শুনলেন অধ্যাপক নীলিমা বসুর মুখে। দেখলেন সংঘে সদস্য হওয়ার শর্ত হল, ‘প্রয়োজন হইলে দেশের মুক্তি সংগ্রামে আমার সর্বস্ব, আমার জীবন পর্যন্ত আমি ত্যাগ করিতে প্রস্তুত।’ প্রীতিলতা তো এমন জীবনই চেয়েছিলেন। অত্যন্ত আনন্দিত হয়ে তিনি ছুটির সময় বাড়ি গিয়ে মাস্টারদার সঙ্গে কাজ করতে চাইলেন। মাস্টারদা প্রীতিলতার আগ্রহের কথা জানতে পেরে তাকে দলের সদস্য করে নেন।

প্রীতিলতা ক্রমেই দেশের স্বাধীনতার জন্য নিঃস্বার্থ আত্মদানকে পবিত্র ধর্মীয় কর্তব্য হিসেবে গ্রহণ করেন। তিনি শ্রীকৃষ্ণের ভক্ত ছিলেন। ভালো বাঁশি বাজাতে পারতেন। তাঁর এ সময়কার মানসিক দ্বন্দ্বের পরিচয় আছে তার রোজনামচায়। ‘.. কোন পথে জীবনকে আমি ভাসিয়ে দিলাম, এই তো আমার টেবিলের সামনে রাধাকৃষ্ণের ছবি। এই প্রেম স্বর্গীয়। এমনভাবেই মাতৃভূমিকে আমাকে ভালোবাসতে হবে। অন্য কোন প্রেম ভালোবাসা আমার হৃদয়ে স্থান পাবে না। রাধার মতোই আমার দেশপ্রেম আমি উজাড় করে ঢেলে দেব, নিজেকে নিঃশেষে আমি দান করে যাব।’

তৎকালীন ইউরোপিয়ান ক্লাব।​ যেখানে ইংরেজদের বিরুদ্ধে আক্রমণের প্রধান নেতৃত্বে ছিলেন প্রীতিলতা ওয়োদ্দেদার।

প্রীতিলতা আইএ পাস করেন মেয়েদের মধ্যে প্রথম হয়ে। কুড়ি টাকা শিক্ষাবৃত্তি পাওয়ায় এবার তাঁর পক্ষে কলকাতায় বেথুন কলেজে পড়া সম্ভব হয়। বেথুন কলেজে ইংরেজিতে অনার্স নিয়েছিলেন, থাকতেন হোস্টেলে। হোস্টেলে থাকাকালীন তার পড়ালেখার চেয়ে আগ্রহ বেশি ছিলো বিপ্লবীদের নিয়ে। তিনি নিয়মিত পত্র আদান প্রদানের মাধ্যমে বিপ্লবীদের খোঁজ খবর রাখতেন। পরে ১৯৩২ সালের এপ্রিল মাসে প্রীতিলতা চট্টগ্রামে ফিরে আসেন। এই সময় তার সাথে দেখা হয় মাস্টারদা ও নির্মল সেনের সঙ্গে। নির্মল সেন তাকে জিজ্ঞেস করেন, ‘পরিবারের প্রতি কিরূপ টান আছে?’ জবাবে প্রীতিলতা বলেন, ‘ Duty to family  কে Duty to Countryর কাছে বলি দিতে পারব।’

প্রীতিলতার সাথে সাক্ষাতের প্রসঙ্গে মাস্টারদা লিখেছেন, “তার চোখেমুখে একটা আনন্দের আভাস দেখলাম। এতদূর পথ হেঁটে এসেছে তার জন্য তার চেহারায় ক্লান্তির কোন চিহ্ন লক্ষ্যই করলাম না। যে আনন্দের আভা তার চোখেমুখে দেখলাম, তার মধ্যে আতিশয্য নেই, Fickleness নেই, Sincerity  শ্রদ্ধার ভাব তার মধ্যে ফুটে উঠেছে। একজন উচ্চশিক্ষিত  Cultured Lady একটি পূর্ণকুটিরের মধ্যে আমার সামনে এসে আমাকে প্রণাম করে উঠে বিনীতভাবে আমার দিকে দাঁড়িয়ে রইল, মাথায় হাত দিয়ে নীরবে তাকে আশীর্বাদ করলাম।”

চট্টগ্রাম শহরের উত্তরদিকে পাহাড়তলী স্টেশনের কাছে ছিল ইউরোপীয়ান ক্লাব, যা ব্রিটিশদের  প্রমোদকেন্দ্র। একমাত্র  শ্বেতাঙ্গরা ব্যতীত এবং ক্লাবের কর্মচারী, বয়-বেয়ারা, দারোয়ান ছাড়া এদেশীয় কেউ ঐ ক্লাবের ধারে কাছে যেতে পারতো না। সন্ধ্যা হতেই ইংরেজরা এই ক্লাবে এসে মদ খেয়ে নাচ, গান এবং আনন্দ উল্লাস করতো।  ক্লাবের সামনের সাইনবোর্ডে  লেখা ছিল “কুকুর  এবং ভারতীয়দের প্রবেশ নিষেধ।” নানা সময়ে ভারতীয় বিপ্লবীরা এই ইউরোপীয়ান ক্লাবে হামলার পরিকল্পনা করলেও তাতে সফল হয়নি। পরে মাস্টারদা ১৯৩২ এর সেপ্টেম্বর মাসে ক্লাবে হামলা করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিলেন এবং এই আক্রমণের দায়িত্ব তিনি নারী বিপ্লবীদের উপর দেবেন বলেন । এই আক্রমণে বিপ্লবীদের মধ্যে প্রধান নেতৃত্বে ছিলেন প্রীতিলতা ওয়োদ্দেদার।

ইউরোপিয়ান ক্লাবের আক্রমণের পর এই স্থানে প্রীতিলতা স্বেচ্ছায় আত্মাহুতি দেন।

বিপ্লবীদের আশ্রয়দাতা যোগেশ মজুমদার ক্লাবের ভিতর থেকে রাত আনুমানিক ১০ টা ৪৫ এর দিকে আক্রমণের নিশানা দেখানোর পরেই ক্লাব আক্রমণ শুরু হয়। সেদিন ক্লাবঘরে প্রায় চল্লিশ জন মানুষ অবস্থান করছিল। তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে বিপ্লবীরা ক্লাব আক্রমণ শুরু করে। পূর্বদিকের গেইট দিয়ে ওয়েভলি রিভলবার এবং বোমা নিয়ে আক্রমণের দায়িত্বে ছিলেন প্রীতিলতা। প্রীতিলতা হুঁইসেল বাজিয়ে আক্রমণ শুরু নির্দেশ দেবার পরেই ঘন ঘন গুলি আর বোমার আঘাতে পুরো ক্লাব কেঁপে উঠছিল। ক্লাব ঘরের সব বাতি নিভে যাবার কারণে সবাই অন্ধকারে ছুটোছুটি করতে লাগল। ক্লাবে কয়েকজন ইংরেজ অফিসারের কাছে রিভলবার ছিল। তাঁরা পাল্টা আক্রমণ করল। একজন মিলিটারী অফিসারের গুলিতে প্রীতিলতার বাঁ-পাশে গুলির আঘাত লাগে। তখন আহত অবস্থায় পুলিশের হাতে বন্দি হয়ে বর্বরোচিত অত্যাচারের সম্মুখীন হওয়ার পরিবর্তে পটাসিয়াম সায়ানাইড  খেয়ে আত্মহননই বেছে নিয়েছিলেন তিনি। তবে মতানুসারে, তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতে নারী সমাজকে আগ্রহী করে তোলার জন্য এবং নারীরা যে এই বিদ্রোহে অংশগ্রহণ করেছে তা জানানোর জন্য তিনি এই আত্মহননের সিদ্ধান্ত নেন।

আন্দোলন৭১/কাজী