শুক্রবার,৫ জুন, ২০২০ অপরাহ্ন

বাঙালির সেই একান্নবর্তী পরিবার এখন...

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ০২ জুন, ২০১৯ ০৮ ২৬

আশরাফি দিবা-

বাঙালির হাজার বছরের সংস্কৃতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে একান্নবর্তী পরিবার। এই একান্নবর্তী পরিবার নিয়ে রচিত হয়েছে হাজারো সাহিত্য, নির্মিত হয়েছে চলচ্চিত্র, নাটক। তবে আজ সমাজের আকাশে যৌথ পরিবার নামক দু-একটা নক্ষত্রের দেখা মিললেও নেই সেখানে প্রাণবন্ত আবেগ আর আবেশ। কালের অতলে হারিয়ে যেতে বসেছে এক্কান্নবর্তী সংসারজীবনের সেই সুমধুর অতীত। একক পরিবারের কালছায়ায় গড়ে উঠছে স্বার্থপর ও হতাশাগ্রস্ত এক সমাজ।

অতীতের সেই একান্নবর্তী সংসারের চিত্র ছিল ভিন্ন, সে যেন এক গল্পকথা। গল্পের প্রধান চরিত্রে থাকতেন দাদা, যিনি হতেন পরিবারের কর্তা এবং তিনি বটবৃক্ষের ন্যায় পুরো পরিবারকে ছায়া দিয়ে রাখতেন। সংসারের সকল সিদ্ধান্ত তিনিই নিতেন এবং তার সিদ্ধান্তেই সংসার পরিচালিত হতো। এই কর্তার স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে ও নাতি-নাতনি ছিলেন গল্পের অন্যান্য চরিত্র। সমাজের প্রথা অনুযায়ী কর্তা বাড়ির মেয়ে বিয়ে দিয়ে অন্য সংসারে পাঠাতেন আর ছেলে বিয়ে দিয়ে ছেলের বউ নিজ সংসারে আনতেন। কর্তার স্ত্রী অর্থাৎ দাদী ছিলেন সংসারের কর্ত্রী। সংসার দেখাশোনা ও রান্নাবান্নার দায়িত্ব ছিল ছেলের বউদের। নাতি-নাতনীরা দাদীর কাছেই বড় হতো। দাদী ছিল তাদের গল্পবুড়ি। মজার মজার ভূতের গল্প, রাক্ষস আর খোক্ষসের গল্প দাদীর কাছে শুনেই বড় হতো এই যৌথ পরিবারের সন্তানেরা। প্রতিটি পরিবার ছিল ভালোবাসার সুতোয় গাঁথা। তবে এগুলো সবই এখন রূপকথা। ধীরে ধীরে আজ আামরা সেই বটবৃক্ষের ছায়া থেকে অনেক দূরে সরে যাচ্ছি।

আমাদের জীবনসংসার এখন পাখির বাসার মতো। একটি ছোট ঘর, ছোটসংসার, ছোটপরিবার; যেখানে বসবাস করে কেবলমাত্র মা-বাবা আর তাদের এক বা দুটি ছেলে-মেয়ে। এইতো এখনকার জীবন যেখানে নেই কোনো আনন্দ; সবই যন্ত্রের মতো, নিরানন্দ, নিঃসঙ্গ। পূর্বের সেই একান্নবর্তী পরিবারে যারা কর্তা-কর্ত্রীর ভূমিকা পালন করতেন, বর্তমান একক পরিবারে তাদের উপস্থিতি মেহমান হিসেবেই গণ্য করা হয়; ঠিক যেন বাইরের লোক। ফলাফল, তারা যে পরিবারের সদস্য সেটা শিশুরা জানছেই না, ওদের মধ্যে দাদা-দাদী, চাচা-ফুফীদের প্রতি কোনো ভালেবাসা, শ্রদ্ধাবোধ বা সহনশীলতা গড়ে উঠছে না। এই না জানার মূলে রয়েছে ওদের বাবা-মা। তাদের মধ্যেই এই মেনে নেওয়াটা ফুটে উঠছে না।

এই সময়ের পরিবারের সন্তানগুলো বৈবাহিক সম্পর্কে জড়ানোর অল্পকিছু দিনের মধ্যেই তার শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বামী-স্ত্রী দুজনের একক পরিবার গড়ে তুলছে; বাদ যাচ্ছে না পরিবারের একমাত্র ছেলেটিও। বৃদ্ধ বাবা-মাকে ছেড়ে নিজেরা আলাদা থাকতেই আজ তারা বেশি স্বাছন্দ্য বোধ করেন। যার ফলশ্রুতিই বৃদ্ধাশ্রম। এছাড়াও বর্তমান সমাজে যে অসহযোগিতার চর্চা দেখা যাচ্ছে তার জন্যও খানিকটা এই একক পরিবারব্যবস্থা দায়ী। এই পরিবারের শিশুরা শিশুবয়স থেকে একলা থাকতে থাকতে জন্মায় স্বার্থপরতা, জানেনা ভাগাভাগির আনন্দ, ত্যাগের মহত্ব। শাসন না পেয়ে হয়ে উঠছে স্বেচ্ছাচারী, গড়ে উঠছে না কোনো হিতাহিত বোধ বা শিষ্টাচারশিক্ষা, যা শিশুর ভবিষ্যত অন্ধকার করে দিচ্ছে।

তবে এই যে ভাঙন, তার কারণ খুব বড় কিছু নয়। ছোট ছোট মনোমালিন্যের জন্যই অনেক যৌথ পরিবার ভেঙে যাচ্ছে। পরিবারের এই মেনোমালিন্যগুলো অনেকটা চোরকাঁটার মতো। চোরকাঁটায় ভরা মাঠ দিয়ে হেটে গেলে যেমন কাপড়ে কাঁটা আটকায় কিন্তু খুব বেশি ক্ষতি করে না, সহজেই কাপড় থেকে সরিয়ে ফেলা যায়, তেমনি পরিবারের মনোমালিন্যগুলোও চাইলেই সহজে মিটিয়ে ফেলা যায়। এসব ছোটখাটো ভুল বোঝাবুঝি বা মনোমালিন্য বড় করে না দেখলেই কিন্তু টিকে থাকতে পারে পরিবারগুলো। প্রয়োজন শুধু পরিবারের সদস্যদের সম্মিলিত ইচ্ছার।

কিন্তু তবু এই বিশ্বায়নের যুগে এসে বাঙালির সেই এক বাড়িতে থাকা, এক হাড়িতে রান্না আর এক বৈঠকে খাওয়া সবই যেন রূপকথার গল্প। ফ্রেমেবন্দী বা অ্যালবামের পাতায় সাজানে পুরনো স্মৃতির গল্পকথা।

আন্দলন৭১/দিবা/এএইচ

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2018 Andolon71
Theme Developed BY Rokonuddin