শুভ জন্মদিন সাদাত হাসান মান্টো

image

নিজস্ব প্রতিবেদক:

সাদাত হাসান মান্টো উপমহাদেশের প্রখ্যাত ক্ষণজন্মা গল্পকার, চিত্রনাট্যকার, অনুবাদক এবং একইসঙ্গে সংলাপ রচয়িতা। বিংশ শতকে এমন ক্ষণজন্মা প্রতিভাধর শক্তিশালী লেখকদের অগ্রজ প্রতিনিধি বলা হয় তাকে। মান্টো একাধারে উর্দু ছোট গল্পকার, চিত্রনাট্য ও সংলাপ রচয়িতা ছিলেন। ভারতের বলিউডের আধুনিক চিত্রনাট্যের জনক বলা হয় তাকে।

ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, ব্রিটিশ শাসিত ভারতে ১৯৩৬-১৯৫৬ পর্বে একটা সাহিত্য আন্দোলন গড়ে উঠেছিল। আমরা বাঙালিরা তাকে ‘প্রগতিশীল লেখক সঙ্ঘ’ নামে জানি। এই আন্দোলনকে প্রায়ই সরলভাবে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির একটা শাখা সংগঠনের আন্দোলন বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে আন্দোলনের পরিচয় এত সরল ছিল না। সেই সাহিত্য-আন্দোলনের ঘূর্ণাবর্তে যে লেখক-সাহিত্যিকরা এসে পড়েছিলেন, তাঁদের অন্যতম ছিলেন সাদাত হাসান মান্টো। ভারত বিভাজনের আগে প্রগ্রেসিভ রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশনে তিনি ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু তাঁকে কখনোই ‘পার্টির লোক’ বলে শনাক্ত করা যাবে না।

১৯১২ এর ১১ মে পাঞ্জাব লুধিয়ানার পাপরউদি গ্রামের ব্যারিস্টার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন সাদত হাসান মান্টো। মান্টোর পূর্বপুরুষ কাশ্মিরী বংশোদ্ভূত ছিলেন।

প্রারম্ভিক জীবনে মান্টো:

মান্টোর পিতা ছিলেন একজন আদালতের বিচারক। কঠোর শাসনেও মান্টো ছোটবেলা থেকে বোহেমিয়ান হয়ে ওঠেন। লেখাপড়ার হাতে খড়ি অমৃতসরের মুসলিম হাই স্কুলে। কিন্তু স্কুলের গন্ডিতে তাঁর মন প্রাণ হাঁপিয়ে উঠতো। পড়ালেখায় অমনোযোগীতার কারণে স্বভাবতই দু’বার এন্ট্রান্স পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে ব্যর্থ হন। কিন্তু স্কুলের পাঠ্য বহির্ভূত গল্প-উপন্যাসের বই পড়ার প্রবল আগ্রহ তাঁকে তরুণ বয়সেই অমৃতসর রেল স্টেশনের হুইলার বুকস্টল থেকে বই চুরিতে প্রলুব্ধ করেছিলো।

১৯৩১ সালে কলেজে পাঠকালীন অবিভক্ত ভারতে স্বাধীনতা সংগ্রামের অশান্ত পরিবেশে মান্টোর লেখাপড়ার ব্যাঘাত ঘটে। ১৯৩২ সালে পিতার মৃত্যুর পর মান্টো আরো অসহায় হয়ে পড়েন। পরিবারের অর্থ কষ্ট লাঘবের জন্যে তখন থেকেই তিনি আয়-উপার্জনের পথ খুঁজতে থাকেন। সে সময় তার্কিক লেখক আবদুল বারি আলিগের সঙ্গে মান্টোর সাক্ষাৎ ঘটে। এই সাক্ষাৎ সাদত হাসান মান্টোর জীবনে একটি মাইলফলক হয়ে উঠে।

সাহিত্য জগতে মান্টো:

আবদুল বারি আলিগ সে সময়ের তরুণ লেখক মান্টোকে রাশিয়ান এবং ফরাসি ভাষা শিখতে উদ্বুদ্ধ করেন। কয়েক মাসের মধ্যেই মান্টো, ভিক্টর হুগোর “The last Day of a Condemned Man” এর উর্দু অনুবাদ করেন। যা পরবর্তীকালে “সারগুজাস্‌ত-ই-আসির”( এক বন্দীর গল্প) নামে উর্দুতে প্রকাশিত হয়। এভাবে মান্টোর হাতে রাশিয়ান গল্পের উর্দু অনুবাদ “রাশি আফ্‌সানে” প্রকাশিত হয়।

এর পরেই বিদেশী সাহিত্য উর্দু ভাষায় অনুবাদ করতে গিয়ে মান্টো অন্য জগতের সন্ধান পান। ক্রমশ তিনি হয়ে ওঠেন উর্দু সাহিত্যের একজন জনপ্রিয় ছোটগল্পকার। তাঁর বিখ্যাত গল্পের মধ্যে আছে বু, টোবা টেক সিং, তামাশা, ঠান্ডা গোশত, কালি সালোয়ার, খালি বোতল, ধুঁয়া ইত্যাদি। তার রচনায় দেশভাগ, সাম্প্রদায়িকতা, দাংগা, মানব চরিত্রের বীভৎসতা বারংবার ঘুরে ফিরে আসে। প্রগতিশীল অসাম্প্রদায়িক চিন্তার এই উর্দু ছোটগল্পকারকে তার মুক্তচিন্তার কারনে অপমানিত, লাঞ্ছিত হতে হয় ভারত পাকিস্তান দুই দেশেই। দেশভাগের পর ১৯৪৮ সালে সপরিবারে তিনি লাহোর চলে যান। পাকিস্তানের কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ, নাসির কাজমি, আহমেফ রহি প্রমুখের সংস্পর্শে আসেন। প্রগতিশীল রাজনৈতিক সাহিত্যচর্চায় তার বিশেষ খ্যাতি হয়।

চলচ্চিত্র জগতে মান্টো:

তিনি একাধারে একজন বেতার লিপি লেখক ও সাংবাদিকও ছিলেন। তাঁর ছোট গল্পের সংকলন Kingdom's end and other stories, একটি উপন্যাস ,তিনটি প্রবন্ধ সংগ্রহ ও ব্যাক্তিগত স্কেচের দুটি সংগ্রহ প্রকাশিত হয়েছে। বোম্বাই চলচ্চিত্র জগত অর্থাৎ বলিউডে মান্টোর অজস্র কাজ রয়েছে। বহু সিনেমার স্ক্রিপ্ট রাইটার হিসেবে প্রথম শ্রেনীর চিত্রাভিনেতা ও পরিচালকদের কাছে মান্টোর কদর ছিল। আট দিন, চল চলরে নওজোয়ান, মির্জা গালিব ইত্যাদি সিনেমার স্ক্রিপ্ট রাইটিং তার কৃতিত্ব।

ক্রমাগত নিম্ন মানের সুরা পানে ‘মান্টো “লিভার সিরোসিস”-এ আক্রান্ত হন। তার জীবনযাত্রা ও ছিল চুড়ান্ত বাউণ্ডুলে এবং বেপরোয়া। শরীরের প্রতি অযত্ন, অপ্রতুল চিকিৎসা, আর্থিক অনটন ইত্যাদিতে জর্জরিত মান্টোর বেঁচে থাকার প্রবল আগ্রহ ব্যাধির কাছে আত্মসমর্পণ করে। মাত্র ৪২ বছর বয়সে তিনি মারা যান।

১৯৫৫ সালের ১৮ জানুয়ারি তাঁর অকাল প্রয়াণ ঘটে তাঁর দ্বিতীয় আবাস ভূমি লাহোরে। তার মৃত্যুতে একদিকে যেমন পাকিস্তান একজন মানবতাবাদী লেখককে হারায়, তেমনি আজও ভারত মর্মে মর্মে উপলব্ধি করছে এমন একজন অসাম্প্রদায়িক চেতনার মান্টোকে। কারণ তার উল্লেখযোগ্য কর্মময় জীবন কেটেছে মুম্বাইয়ে।

আন্দোলন৭১/আকাশ